সাগরের তলদেশে পাওয়া ২ হাজার বছরের পুরোনো শত শত পাত্রে কী আছে

· Prothom Alo

ইতালির জেলে ও ডুবুরি জিয়াকোমো দে মোলা পানির নিচে ডুব দিয়েছিলেন মাছের খোঁজে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এমন এক দৃশ্য দেখলেন যে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! প্রথমে যাকে তিনি বিশাল একটি পাথর ভেবেছিলেন, সেটি আসলে প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো একটি রোমান বাণিজ্যিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। আর সেই জাহাজের ভেতর স্তূপ হয়ে আছে শত শত মাটির পাত্র।

Visit sportbet.rodeo for more information.

সম্প্রতি ইতালির সিসিলি দ্বীপের মাজারা দেল ভাল্লোর উপকূলে জিয়াকোমো দে মোলা ও তাঁর সহকর্মী ইগর বিসুল্লি মাছ ধরছিলেন। দুজনই পেশাদার জেলে ও ডুবুরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০ থেকে ৫০ মিটার নিচে ডুব দিয়ে মাছ ধরার সময় তাঁরা বড় ও কালো আকৃতির একটি বস্তু দেখতে পান। পানির নিচে দৃষ্টিসীমা ঝাপসা থাকায় প্রথমে সেটিকে একটি বড় পাথর বলেই মনে হয়েছিল।

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো অস্ত্র কোনটি
দে মোলা ও তাঁর সহকর্মী ইগর বিসুল্লি দুজনই পেশাদার জেলে ও ডুবুরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০ থেকে ৫০ মিটার নিচে ডুব দিয়ে মাছ ধরার সময় তাঁরা বড় ও কালো আকৃতির একটি বস্তু দেখতে পান।

তবে দে মোলার মনে হলো, আরেকটু কাছে গিয়ে দেখা যাক। শেষবারের মতো লম্বা শ্বাস নিয়ে তিনি আরও নিচে নামলেন। কাছে যেতেই তাঁর ভুল ভাঙল। এটি কোনো পাথর নয়। তাঁর ঠিক সামনেই পড়ে আছে শত শত প্রাচীন মাটির পাত্র। ২ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সমুদ্রের তলদেশে মাটির পাত্রগুলো এভাবেই পড়ে আছে।

পানির ওপরে উঠে দে মোলা তাঁর সহকর্মী ইগরকে অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘ওখানে কী আছে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না!’ এরপর দুই জেলে মিলে বিষয়টি সিসিলির আঞ্চলিক সমুদ্রবিষয়ক প্রত্নতত্ত্ব কর্তৃপক্ষকে জানান। সেখান থেকে খবর যায় প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা ইতালির সামরিক পুলিশ ইউনিট কারাবিনিয়েরির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা দলের কাছে। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিষয়টি যাচাই করে দেখে।

তখনই নিশ্চিত হওয়া যায়, সমুদ্রের নিচে পড়ে থাকা পাত্রগুলো আসলে একটি প্রাচীন রোমান বাণিজ্যিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষের অংশ। কারাবিনিয়েরি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে প্রথম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে এটি ভূমধ্যসাগরের জলপথে বাণিজ্য করার জন্য চলাচল করত।

আদিম মানুষের প্রথম হাতিয়ার
পাত্রগুলো সমুদ্রের ৪৬ মিটার নিচে এক জায়গায় স্তূপ হয়ে জমা আছে। জমে থাকা স্তূপের উচ্চতা প্রায় ৭ ফুট। পুরো স্তূপটি ২০ মিটারের বেশি লম্বা এবং প্রায় ৬ মিটার চওড়া জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

পাত্রগুলোতে কী ছিল

অ্যাম্ফোরা হলো প্রাচীনকালে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বিশেষ একধরনের মাটির পাত্র। সাধারণত এগুলোতে পানীয় ও জলপাইয়ের তেলের মতো তরল পণ্য রাখা হতো। তখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পণ্য নিয়ে যাওয়ার জন্য এসব পাত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আবিষ্কৃত এই জাহাজেও এমন শত শত অ্যাম্ফোরা পাওয়া গেছে। ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর মধ্যে বেশির ভাগ পাত্রই ‘ড্রেসেল ১এ’ ধরনের। ড্রেসেল ১এ ধরনের অ্যাম্ফোরাগুলো মূলত প্রাচীন ইতালিতে তৈরি পানীয় পরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া কিছু পাত্র আবার উত্তর আফ্রিকায় ব্যবহৃত হতো। এর মধ্যে আরও পুরোনো একটি নিও-পিউনিক অ্যাম্ফোরাও পাওয়া গেছে।

ডুবুরিরা সিসিলির উপকূলে ২ হাজার বছরের পুরোনো জাহাজডুবির সন্ধান পান

পাত্রগুলো সমুদ্রের ৪৬ মিটার নিচে এক জায়গায় স্তূপ হয়ে জমা আছে। জমে থাকা স্তূপের উচ্চতা প্রায় ৭ ফুট। পুরো স্তূপটি ২০ মিটারের বেশি লম্বা এবং প্রায় ৬ মিটার চওড়া জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

মানুষ ৪ লাখ বছর আগে প্রথম আগুন জ্বালিয়েছিল ইংল্যান্ডে, দাবি বিজ্ঞানীদের
অ্যাম্ফোরা হলো প্রাচীনকালে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বিশেষ একধরনের মাটির পাত্র। সাধারণত এগুলোতে পানীয় ও জলপাইয়ের তেলের মতো তরল পণ্য রাখা হতো।

জাহাজটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

সেখানে শুধু পাত্রই নয়, জাহাজটির আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিসার তৈরি দুটি নোঙরের দণ্ড এবং একই উপাদানে তৈরি আরও একটি কাঠামো। ইতালির সংস্কৃতিমন্ত্রী আলেসান্দ্রো জিউলি এটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার বলে উল্লেখ করেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ভিডিওতে ডুবুরিদের আবিষ্কৃত স্থানটি পরিমাপ ও নথিবদ্ধ করতে দেখা গেছে।

এই আবিষ্কারটি আরও একটি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, বিপুলসংখ্যক অ্যাম্ফোরার ভারী স্তূপটি হয়তো জাহাজটির কাঠের মূল কাঠামোটিকে তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করতে সাহায্য করেছে। সেটি সত্যি হলে প্রাচীন রোমানদের জাহাজ নির্মাণের কৌশল ও প্রযুক্তি সম্পর্কে চমৎকার সব নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদ লুসি ব্লু এই আবিষ্কারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে তাঁর মতে, এই প্রাচীন রোমান জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগের সময়ের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও পণ্য আদান-প্রদান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে জাহাজটির কাঠামো অক্ষত থাকলে প্রাচীনকালের জাহাজ নির্মাণপ্রযুক্তি সম্পর্কেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

৪ লাখ ৩০ হাজার বছরের পুরোনো প্রাচীনতম লাঠির খোঁজে
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, বিপুলসংখ্যক অ্যাম্ফোরার ভারী স্তূপটি হয়তো জাহাজটির কাঠের মূল কাঠামোটিকে তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করতে সাহায্য করেছে।

প্রাচীনকালের বাণিজ্যের গল্প

সিসিলি দ্বীপের আশপাশের সমুদ্রপথ প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যপথ ছিল। সিসিলির বিভিন্ন এলাকায় প্রাচীন গ্রিকরা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। পরে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৪১ সালে অঞ্চলটি রোমানদের দখলে আসে। প্রথম পিউনিক যুদ্ধের পর রোমান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সিসিলিই ছিল তাদের দখল করা প্রথম বিদেশি প্রদেশ। তাই সমুদ্রের তলায় পড়ে থাকা এই পাত্রগুলো শুধু পুরোনো মাটির পাত্র নয়; এগুলো প্রাচীন মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য এবং এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মতে, এই আবিষ্কার থেকে জানা যেতে পারে, সেই সময়ে ঠিক কারা এই জলপথ ব্যবহার করত। একই সঙ্গে বোঝা যাবে, ভূমধ্যসাগরের এই পথে সে সময় ঠিক কী ধরনের বাণিজ্য চলত। সংস্কৃতিমন্ত্রী জিউলির ভাষায়, ‘সমুদ্র এখনো ইতিহাসের মূল্যবান সব টুকরো আমাদের সামনে তুলে ধরছে। মাজারা দেল ভাল্লোর এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সেই সময়ের মানুষ, তাঁদের চলাচলের পথ এবং বাণিজ্যের এক জীবন্ত গল্প আমাদের শোনাতে পারে।’

৫ হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর প্রথম শহরের হদিস মিলল ইরাকে
খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৪১ সালে সিসিলি অঞ্চলটি রোমানদের দখলে আসে। প্রথম পিউনিক যুদ্ধের পর রোমান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সিসিলিই ছিল তাদের দখল করা প্রথম বিদেশি প্রদেশ।

এখনই তোলা হচ্ছে না মাটির পাত্রগুলো

এখনই অবশ্য পুরো জাহাজ বা পাত্রগুলো সমুদ্র থেকে তুলে আনার কোনো পরিকল্পনা বিজ্ঞানীদের নেই। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রথমে স্থানটি নিয়ে আরও ভালোভাবে গবেষণা করবেন এবং এর একটি সম্পূর্ণ মানচিত্র বা রূপরেখা তৈরি করবেন। ধ্বংসাবশেষটি কতটা ভঙ্গুর, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা হবে। অতীতে কেউ সেখানে গিয়ে পাত্র বা অন্য কোনো নিদর্শন লুট করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। ভবিষ্যতে হয়তো কিছু নিদর্শন গবেষণার জন্য সমুদ্র থেকে তুলে আনা হতে পারে। জায়গাটি স্কুবা ডাইভার বা ডুবুরিদের জন্য একটি দারুণ দর্শনীয় স্থানেও পরিণত হতে পারে। আবার গবেষণা শেষে একসময় পুরো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ তুলে আনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।

তবে আপাতত সমুদ্রের তলদেশেই থাকছে ২ হাজার বছরের পুরোনো জাহাজ ও তার শত শত পাত্র। সেখানেই এগুলো সুরক্ষিত ও গবেষণাধীন থাকবে। এই অনন্য আবিষ্কারের জন্য জিয়াকোমো দে মোলা ও ইগর বিসুল্লিকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

দে মোলার জন্য এটি নিঃসন্দেহে জীবনের অন্যতম অবিশ্বাস্য এক মুহূর্ত। প্রায় ২০ শতাব্দী ধরে মানুষের চোখের আড়ালে থাকা জায়গাটি হঠাৎ করেই তাঁর চোখের সামনে ধরা দিয়েছিল! দে মোলা রোমাঞ্চিত হয়ে বলেছেন, ‘প্রায় ২০ শতাব্দী পর এই জায়গাটি দেখতে পাওয়া প্রথম কয়েকজন মানুষের একজন হতে পেরে আমার যে অনুভূতি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এক আবিষ্কার।’

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলোসূত্র: সিএনএনআদিম যুগে মানুষ কীভাবে আফ্রিকা থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল

Read full story at source