ফেসবুকের বুকে তালা-চাবির গল্প
· Prothom Alo

মিনিটে মিনিটে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে বোরহানের হাত নিশপিশ করে। বেশি স্ট্যাটাস দিলে ভালো রিচ হয় না, এটাও জানে সে। জানা-বোঝায় সত্য-মিথ্যা থাকতে পারে; তবু জেনে-শুনে বিষ পান করতে ভালো লাগে। আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর বালিশের নিচ থেকে স্মার্টফোনটা বের করে নোটিফিকেশন দেখল বোরহান। যথারীতি গতকাল ঘুমানোর আগমুহূর্তে দেওয়া স্ট্যাটাসটাতেও তেমন একটা লাইক-কমেন্ট পড়েনি। ফেয়ার শেয়ার অনেক দূরের পথ। সবই কেন যেন শূন্যের খাতায়। নিজের স্ট্যাটাস-ভাগ্যের নিকুচি করে বোরহান তৎক্ষণাৎ লিখল, ‘ভাল্লাগে না কিচ্ছু’!
Visit betsport.cv for more information.
ভালো লাগবেই–বা কেন। নগদ টাকায় কেনা ডাটা, অমূল্য সময়, আঙুলের শ্রম, চোখের কসরত—সেসব খরচ করে মূল্যবান কথা লিখলেও মানুষ মনোযোগ দেবে না; বাট হোয়াই! মানুষ এত অকৃতজ্ঞ হয় কী করে, আদতে এরা চায়টা কী!
কী আশ্চর্য, ‘ভাল্লাগে না কিচ্ছু’ স্ট্যাটাসে দেড় মিনিটের মাথায় প্রথমেই লাভ রিঅ্যাক্ট পড়ল! কারও কাছে কিছু ভালো না লাগাটা কি অন্যের ভালো লাগার বিষয়? পুলক বোধ করা যায় এমন ভাষ্যে! আরও এক মিনিট পর কমেন্ট করল ফেসবুক বন্ধু মজিদ, ‘এইবার ভালা লাগানির ট্যাবলেট আবিষ্কার কইরা ফালান! নিজে বাঁচেন, লাখো রোগীরেও বাঁচান!’
কী আশ্চর্য জাকারবার্গ-সৃষ্ট জোকার–দুনিয়ার ফেসবুক। এখানে ভালো না লাগলেও বলা যাবে না। লোকজন সিরিয়াস বিষয় নিয়েও ফোড়ন কাটবে। আরও কিছু নেতিবাচক মন্তব্য আসার পর নতুন করে চতুর্থ স্ট্যাটাসটা দিল বোরহান, ‘ইদানীং সবকিছুতে আমার এত আনন্দ হয় কেন? তবে কি সুখী মানুষের কাতারে উঠে পড়লাম!’
এবার স্যাড-হাহা রিঅ্যাক্টের সঙ্গে কমেন্টও পড়তে থাকলে বৈশাখ মাসের গরমে ঘামধারার মতো।
প্রথম মন্তব্যটা করল পাড়াত বন্ধু মিনহাজ, ‘অন্যের টাকা মেরে দেওয়ার মতো সুখ অন্য কিছুতেই নেই। গত সপ্তাহে তোকে ২০ টাকা ধার দিলাম। দুইটা টাকাও ফেরত পেলাম না। তবুও তুই সুখী হ!’ ছোটলোকি আচরণ না! বোরহান একবারও বলেনি ধার শোধ করবে না। একটু সময় লাগছে এই যা।
‘অচেনা একজন’ আইডি মন্তব্য করল, ‘জি ভাই। আপনাদেরই সুখের দিন। আমরা কলুর বলদ হয়ে খেটেই মরলাম।’
সুখী আক্তার লিখল, ‘ইনবক্সে উল্টাপাল্টা কিছু লিখলে নগদে ব্লক করে দেব।’ বিশুদ্ধতাবাদী ফেসবুক কবি বিসর্গ তোতন মন্তব্য করলেন, ‘মনপ্রাণ লাগিয়ে স্ট্যাটাসগুলো পড়লাম। ভালো কোনো মনীষী বর্তমানে থাকলে বলতেন, “আইডি খুলেছিস যখন, বিনোদন দিয়ে যা!” ফেসবুকই এখন রেডিও দেখায়, রিল শোনায়। কারও চরিত্র জানতে এখন জ্যোতিষী লাগে না, ফেসবুকই যথেষ্ট।’
বোরহান জেনেছে, এই কবি সম্প্রতি ষাটের দশকের জনৈক বয়োজ্যেষ্ঠ কবিকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলেন। তিনি অ্যাকসেপ্ট করায় ব্যানার হাতে আনন্দ করেছিলেন বিসর্গ তোতন। পরে মিছিলের ছবিগুলো কবিকে ট্যাগ করার পরও তিনি কোনো উচ্ছ্বাস দেখাননি, মন্তব্য করেননি। মামুলি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন মানে লাইকটাও দেননি। তার মেসেঞ্জারেও ছবি সিন করেছেন, রিপ্লাই আসেনি।
বাধ্য হয়ে দ্বিতীয়বার নিরানন্দ মিছিল করেছেন বিসর্গ তোতন, আহ্বান ছিল অকৃতজ্ঞ কবিকে বয়কটের!
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাজে মন্তব্যের প্রতিবাদে নিরানন্দ মিছিল করেন বিসর্গ তোতন। তাঁর ধারণা, বিষয়টা অন্যদের চেতনায় সঞ্চারিত করে দেওয়ার পথিকৃৎ তিনি। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে নতুন ধারার প্রতিবাদ।
এক ঘণ্টা পর বোরহান বুঝতে পারল, ফেসবুকবাসী ভালো-খারাপ কোনো খবরই নিতে পারে না। বক্রোক্তিই সহজাত। এর চেয়ে বরং নিজের সুখে থাকার বানোয়াট গল্প শোনানোই মঙ্গল। তাতে মহামূল্যবান লাইক-কমেন্ট দেদার পাওয়া যাবে। অন্যকে হিংসায় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারার মতো সুখ আর কিসে আছে, কোথায় মেলে এমন প্রশান্তি!
নতুন আরেকটা স্ট্যাটাস দিল বোরহান, ‘ভেবে দেখলাম, রেডি ফ্ল্যাট কেনার চেয়ে জায়গা কিনে নিজেদের হাতেই বাড়ি বানানো ভালো। তাতে পছন্দসই বাড়ি মেলে, বাড়ির ওপর মায়া-মমতাও বৃদ্ধি পায়। যাই, বসুমতী অনাবাসিক এলাকায় জায়গার বায়নাপত্রটা করেই ফেলি।’
এবার হলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একজন হা হা রিঅ্যাক্ট দিয়ে মন্তব্য লিখল, ‘এত দিন জানতাম তোমার চাকরি নেই। এখন দেখছি বসুমতী অনাবাসিক এলাকার মতো সম্ভ্রান্ত জায়গায় বাড়ি করার মতো সামর্থ্যও আছে! এটাকেই তোমরা ক্রমান্বয়ে আবাসিক এলাকা করে তুলবে। খুব ভালো!’
পাল্টা জবাব দেওয়ার আগেই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। গলায় মধু ঢেলে বোরহানের মেজ খালা বললেন, ‘তুই কেমন আছিস, বাপ? খালাম্মার কোনো খোঁজখবর নিস না! তোর ভাই-বোনদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখিস না!’
খালা ওদের পাত্তা দেন না বললেই চলে। এমনকি আপন বোনকেও না। সেই খালার আজ কী হলো? বেশিক্ষণ অবুঝ থাকার সুযোগ পাওয়া গেল না।
ওরা সকালে কী খেয়েছে, দুপুরে কী খাবে এমন সব পেটান্তরিক (পেট+আন্তরিক) প্রশ্নের পর খালা চিকন সুরে বললেন, ‘তোর খালু ভীষণ অসুস্থ। জানিস তো?’
‘কী হয়েছে খালুজানের?’ ‘ভীষণ জ্বর।’
‘তাহলে চাপা...মানে নাপা খাইয়ে দাও। ট্যাবলেট বা সিরাপ।’
‘হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। অবস্থা সিরিয়াস। হাতে টাকাপয়সাও নাই। তুই আমাদের ৫০ হাজার টাকা ধার দিবি?’ আকাশ থেকে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিল বোরহান, ‘এত টাকা কোথায় পাব? জানো না, আমার এখনো চাকরি হয়নি।’
‘তোর বোন, আমাদের মনীষা–ও তো বলল, কোথায় যেন জায়গা কিনতে যাচ্ছিস! আগামী কোরবানির জন্য তিনটা গরুও কিনে রাখছিস অগ্রিম।’
‘ওসব ফেসবুক স্ট্যাটাস, খালা। মানে নিজের স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্যই এসব লেখা হয়! মনীষা নিজেও তো বানিয়ে বানিয়ে কত কিছু লেখে! এসব বলে না তোমাদের?’
খালা ‘দড়াম’ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন, বোরহানের কানে যেন তালা লেগে গেল!
এই তালা খোলার চাবিও কিন্তু আছে।
আরেকটা চটকদার স্ট্যাটাস!