শার্ট না কিনে গাছের চারা কিনেছিলেন হাসমত, এখন তাঁর ১২ বিঘার বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের উদ্যান

· Prothom Alo

বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সংরক্ষণের স্বপ্ন নিয়ে নিজের ১২ বিঘা জমিতে উদ্যান গড়ে তুলেছেন জামালপুরের কলেজশিক্ষক হাসমত আলী। এবার জাতীয় পরিবেশ পদক পাওয়া এই প্রকৃতিপ্রেমীর গল্প শোনাচ্ছেন আরিফুল গণি

Visit rouesnews.click for more information.

কলেজে পড়ার সময় শার্ট কিনতে একবার জামালপুর গিয়েছিলেন হাসমত আলী। শহরে রাস্তার পাশের একটি নার্সারিতে একটি গাছের চারা দেখে মনে ধরে যায়। দাম জিজ্ঞেস করে হিসাব কষে দেখেন, গাছটি কিনলে আর শার্ট কেনা হবে না। শেষ পর্যন্ত শার্ট না কিনে ২৫০ টাকায় সাইকাস পামের চারাটি কিনেই বাড়ি ফিরলেন।

৩৭ বছর পর সেই গাছ এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার পাশে হাঁটতে হাঁটতে হাসমত আলী বললেন, ‘গাছটির দিকে তাকালে মনটা ভরে যায়।’

শুধু সাইকাস পামই না, রীতিমতো একটা উদ্যান গড়ে তুলেছেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার ফরহাদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের বাংলার এই সহকারী অধ্যাপক। সেই উদ্যান দেখতেই সম্প্রতি গিয়েছিলাম সরিষাবাড়ীর দৌলতপুর। জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের পাশের রেলফটক পেরিয়ে ইট বিছানো সরু সড়ক।

এরপর মাটির রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশ, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলোছায়ার খেলা, কোথাও অপরিচিত গাছে ফুটে আছে নানা রঙের ফুল, কোথাও ঘন সবুজের আড়ালে পাখির ডাক—সব মিলিয়ে সবুজ এক জগৎ।

প্রয়াত প্রকৃতিবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার নামে বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের বাগান গড়ে তুলেছেন হাসমত আলী

৭০০ প্রজাতির গাছের উদ্যান

সেই যে শার্ট না কিনে গাছের চারা কিনলেন, তারপর থেকে যেখানে যেতেন, গাছের বীজ বা চারা সংগ্রহ করতেন। দু–একটি করে গাছ এনে বাড়ির পাশে কিংবা জমির আলে লাগাতেন। ২০০৪ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার পরও সেই কাজ থামেনি। ২০১৬ সালে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন, বাবার চার একর জমিতে একটি উদ্যান গড়ে তুলবেন।

তবে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত করাটা সহজ ছিল না। হাসমত আলী বলেন, ‘আমার পরিবার থেকেও বাধা এসেছিল। বিশেষ করে মায়ের একটু বাধা ছিল। আমাকে অনেক ফাইট করতে হয়েছে। গ্রামের মানুষও নানা কথা বলত। আমার স্ত্রীও কলেজশিক্ষক। তিনি যখন বাইরে যেতেন, অনেকে তাঁকে বলত, “তোমার জামাই এগুলো কী করছে? কিছু বলো না? পাগলামি শুরু করেছে!” কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।’

গাছ লাগানো অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে যেসব দুর্লভ উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো সংগ্রহ করে এনে রোপণ করতে থাকেন। একটি গাছ দেখিয়ে বললেন, ‘এটি গুটগুটিয়া। বুনো পাহাড়ি ভেষজ গাছ। এই গাছের টক স্বাদের ফল মুখের অরুচি দূর করে।’ এক একে কানাইডিঙ্গা, বৈলাম, উরিআম, কুরচি, কন্যারি, মাইলাম, চালমগরা, বাঁশপাতা, ডাকরুম, তাসবি, কেয়ামন, তুন, শিলবাটনা, গুটগুটিয়া, রক্তন, কামদেব, রিটা, চিকরাশি, নাগলিঙ্গমসহ নানা প্রজাতির গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন অধ্যাপক হাসমত। জানালেন, উদ্যানটিতে রয়েছে প্রায় ৭০০ প্রজাতির পাঁচ হাজার উদ্ভিদ।

উদ্যানের ভেতর দুটি পুকুর আছে। তিনি বলেন, ‘চিন্তা করলাম, এটাকে যদি একটা উদ্যান করতে হয়, তাহলে একটা জলাশয় দরকার। পানি না থাকলে পাখি বা অন্য প্রাণীও থাকবে না। তাই এখানে একটা পুকুর করলাম। পাড়জুড়ে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগালাম।’ পুকুরের পাড়ে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কেউ কেউ কলাগাছ, পেঁপেগাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন, কেউ বলেছেন মাঝখানে সবজি চাষ করতে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি হাসমত।

২০২২ সাল পর্যন্ত উদ্যানটির আনুষ্ঠানিক কোনো নাম ছিল না। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা নাম চাইলেন হাসমত। নিসর্গী দ্বিজেন শর্মার নামে উদ্যানটির নাম প্রস্তাব করেন ‘দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদ উদ্যান’। পরে নিজেই সেখানে গিয়ে উদ্যানটির উদ্বোধন করেন সেলিনা হোসেন।

হাসমত আলীর উদ্যানে প্রজাপতি পার্ক

ফুলের কানে প্রজাপতি এসে...

উদ্যান গড়ে তোলার পর সেখানে নানা ধরনের ফুলের গাছ লাগান হাসমত। একসময় খেয়াল করলেন, ফুল ফুটলেই সেখানে ভিড় করছে নানা রঙের প্রজাপতি। বিশেষ করে রঙ্গন ফুটলে প্রজাপতির আনাগোনা তাঁকে মুগ্ধ করত, ‘কলেজ থেকে এসে প্রায়ই এখানে বসতাম। রঙ্গনগাছে যখন লাল ফুল ফুটত, প্রজাপতিতে ভরে যেত। আমার কাছে এত ভালো লাগত যে মনে হলো, এই প্রজাপতিগুলোকে যদি সব সময় এখানে রাখা যেত!’ সেই ভাবনা থেকেই ২০২০ সালে উদ্যানের ভেতরে তৈরি করেন প্রজাপতি পার্ক। এ কাজে তাঁকে পরামর্শ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজাপতি গবেষক ড. মনোয়ার হোসেন। প্রজাপতির জন্য নেট হাউস কীভাবে তৈরি করতে হবে, সেখানে কী ধরনের পরিবেশ রাখতে হবে, কোন গাছ লাগাতে হবে—এসব বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নেন হাসমত। প্রজাপতির জীবনচক্রের জন্য প্রয়োজনীয় হোস্ট প্ল্যান্টও লাগানো হয়।

প্রকৃতি সংরক্ষণের ধারণাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গড়ে তুলেছেন ‘প্রাণ-প্রকৃতি পাঠাগার’। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘নিসর্গপাঠ স্কুলে’ ছুটির দিনে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে শেখানো হয়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর করতে প্রতিবছর আয়োজন করেন শিমুল ফোটা উৎসব।

অর্থ হাতে এলেও তা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে কোন রাশির জাতকের শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে শেখানো হয় ‘নিসর্গপাঠ স্কুলে’

জোনাকির জন্য বাড়ি

শৈশবের আরেকটি স্মৃতি হাসমতকে ভাবিয়েছে, ‘একসময় আমরা জোনাকির পেছনে দৌড়াতাম, দেখতাম। এখন সেই জোনাকি অনেকটাই নেই। তাই ভাবলাম, এটা নিয়ে কিছু করা যায় কি না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।’ বিশেষজ্ঞরা তাঁকে জানান, জোনাকির জন্য আর্দ্র ও নিরিবিলি পরিবেশ দরকার। সেখানে লতা, ঘাস ও পাতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। কৃত্রিম আলো যাতে প্রবেশ না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সেভাবেই জোনাকির জন্য তৈরি করেন একটি নেট হাউস। হাসমত বলেন, ‘বাইরে থেকে কিছু জোনাকি এনেও ছেড়েছিলাম। বেশ কিছুদিন ছিল। হয়তো কিছুটা প্রজননও করেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে জোনাকি ফিরিয়ে আনতে এখনো সফল হইনি। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।’

স্বপ্ন আরও বড়

প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ‘জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২৫’ পেয়েছেন হাসমত আলী। বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে আগেই পেয়েছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার-২০২৩’। প্রজাপতি সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড-২০২৩’। জলবায়ু, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পেয়েছেন আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা।

এই একটি উদ্যানেই থেমে থাকতে চান না হাসমত আলী। তাঁর স্বপ্ন, দেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে উঠুক ‘দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদ উদ্যান’-এর মতো অন্তত একটি করে উদ্যান। এ লক্ষ্যে একটি ফাউন্ডেশন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। আর নিজের উদ্যানে থাকা বিরল ও বিপন্ন গাছগুলোর মাতৃগাছ তৈরি করতে চান। তাঁর ভাষায়, একসময় তিনি থাকবেন না, কিন্তু উদ্যানটি থাকবে। তখন যাঁরা এসব গাছ সংরক্ষণ করতে চাইবেন, তাঁরা এখান থেকে বীজ বা চারা নিতে পারবেন।

বড়শিতে উঠল ৭৬ কেজি ওজনের মাছ

Read full story at source