নিজস্ব ক্যাম্পাস ছাড়াই ২৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ভাড়া স্থাপনায় যেনতেন পাঠদান
· Prothom Alo

উঁচু-নিচু সরু সড়ক। যানবাহন চলাচলেরও অবস্থা নেই। স্থানীয় লোকজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা আরও সামনে যেতে বললেন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর একজন একটি ভবন দেখিয়ে বললেন, ‘এটাই বিশ্ববিদ্যালয়’।
তিনতলা নির্মাণাধীন ভবনটি বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়। আশপাশের সাধারণ বসতবাড়ির মতো দেখতে ভবনটিতে চলে প্রযুক্তিনির্ভর তিন বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম—সাইবার সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং।
Visit esporist.org for more information.
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ভাড়া করা এই অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির (ইউএফটিবি) শিক্ষা কার্যক্রম। সেখান থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে আরেকটি ভাড়া ভবনেও চলে শিক্ষা কার্যক্রম; আর মাঝামাঝি আরেকটি ভাড়া ভবনে চলে প্রশাসনিক কাজ। ছোটখাটো তিনটি ভবনে সাধারণ মানের একটি বিদ্যালয়ের সমপরিমাণ বা তারও কম অবকাঠামোয় চলছে প্রযুক্তি খাতের বিশেষায়িত এই বিশ্ববিদ্যালয়।
শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সব মিলিয়ে দেশে ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একই দশা—নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। এর মধ্যে পাঁচটিতে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী আছে; শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নেই নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস।
ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ফলে কার্যত এ ধরনের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেনেটুনে’ পড়ালেখা হচ্ছে বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
ইউজিসি সূত্র জানায়, এই ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৪টি অনুমোদন দেয় ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। আর ঢাকার সাত কলেজের জন্য ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনে, কোনোটি ভাড়া করা ভবনে, আবার কোনোটি একাধিক জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্থায়ী স্থাপনায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি নির্ধারণ করা হলেও অবকাঠামো নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বছরের পর বছর পার হলেও শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পাচ্ছেন না। ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ফলে কার্যত এ ধরনের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেনেটুনে’ পড়ালেখা হচ্ছে বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
এমন পরিস্থিতি এক দিনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পাস করে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হয়।
সুবিপ্রবির প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে শান্তিগঞ্জ এলাকার এই ভাড়া করা বাড়িতেস্থায়ী ক্যাম্পাস নেই
স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো হলো জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি—খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় চারটি—চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ছাড়া বিশেষায়িত ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ইউজিসির চেয়ারম্যাননিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগেই হয়েছে এবং প্রায় সব কটিরই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এখন এগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়মকানুনের মধ্যে আনা এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে। এগুলো দুই থেকে সাতটি পর্যন্ত বিভাগ নিয়ে চলছে, দু-একটির বিভাগ আরও বেশি। এর মধ্যে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে সরাসরি শিক্ষার্থী পড়েন না। মাদ্রাসা, কলেজ ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই তাদের অধীনে চলে। কার্যক্রম চালু থাকা বাকি ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী আট হাজারের কিছু বেশি।
পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো হলো মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ খোলার অনুমোদন পায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ওই দুই বিভাগে ইতিমধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। আর অস্থায়ী ব্যবস্থায় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে সম্প্রতি।
নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পেছনে বিপুল টাকা খরচ হচ্ছে ভাড়া বাবদ। যেমন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে ভ্যাট ও কর বাদে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।
‘আহসানমারা সেতুর পূর্ব পাশে দেখার হাওরের পাড়ে’ হওয়ার কথা সুবিপ্রবির স্থায়ী ক্যাম্পাস। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে স্থায়ী ক্যাম্পাসের কোনো লক্ষণ নেই।
অগ্রগতি কার কত
ইউজিসির সূত্রমতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কোনোটি কোনোটির সমীক্ষা শেষ হয়েছে। অন্য কয়েকটির নির্মাণকাজ চলছে।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখনো ভূমি অধিগ্রহণ হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্থায়ী ক্যাম্পাসের প্রক্রিয়া চলছে। প্রায় ২৫০ একর জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে একটি ডিপিপি একনেকে উঠেছিল। কিন্তু অনুমোদন না দিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। বর্তমানে অস্থায়ী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী দৌলতপুর ও খালিশপুর এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের ৫ জুলাই ‘খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন পাস হয়। এরপর ২০১৮ সালে প্রথম উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে শুরু হয় এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। নেত্রকোনার রাজুরবাজার এলাকায় ৫০০ একর জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সব কার্যক্রম এখনো অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে। এ ছাড়া দুটি বিভাগের কার্যক্রমও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে। তবে অন্য বিভাগগুলো সম্প্রতি স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়েছে। চারটি অনুষদের ১০টি বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থী প্রায় এক হাজার।
সুনামগঞ্জের মতোই স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাবে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অস্থায়ী ব্যবস্থায় চলছে প্রযুক্তি খাতের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)। ৩০ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম তিনটি ভাড়া করা ভবনে ছড়িয়ে আছে।
যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু
ইউজিসি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পর ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া হচ্ছে। এরপর নতুন নতুন বিভাগ চালুর তোড়জোড়ও শুরু হয়।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) আইন পাস হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। এর প্রায় দেড় বছর পর ২০২২ সালের জুনে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে। শুরু থেকেই জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাড়া করা বিভিন্ন ভবনে চলছে কার্যক্রম। শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরের ওই এলাকায় যাতায়াত ও বসবাসের নানা সংকট রয়েছে।
‘আহসানমারা সেতুর পূর্ব পাশে দেখার হাওরের পাড়ে’ হওয়ার কথা সুবিপ্রবির স্থায়ী ক্যাম্পাস। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে স্থায়ী ক্যাম্পাসের কোনো লক্ষণ নেই। স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। চারটি বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম চলছে—কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও গণিত। শিক্ষার্থী ৪৮০ জন, শিক্ষক ১৫ জন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ২৪ জন।
গত ৩০ আগস্ট সরেজমিন দেখা যায়, আহসানমারা সেতুর পূর্ব পাশে দেখার হাওরের যে জায়গায় স্থায়ী ক্যাম্পাস হওয়ার কথা, সেখানে থইথই পানি। ফসলি জমি আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু বাড়িঘর। একটু হাঁটলেই সড়কের ডান পাশে একটি সাইনবোর্ড—‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিগঞ্জ, অস্থায়ী অতিথি ভবন’। তিনতলা ভবনটিতে উপাচার্য, সহ-উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা থাকেন।
শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর আগে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকলেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সড়ক ধরে জয়কলস উজানীগাঁও মোড় পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই দক্ষিণ পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী প্রশাসনিক ভবনের আরেকটি সাইনবোর্ড। সড়কের পাশের একটি বাড়ির দোতলার একাংশ ভাড়া নিয়ে এখানে উপাচার্যের কার্যালয় করা হয়েছে।
শান্তিগঞ্জ বাজার পেরিয়ে ডান পাশে জামেয়া হাজী আক্রম আলী দাখিল মাদ্রাসা। এর চারতলা ভবনের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলা নিয়ে চলছে দুটি বিষয়ের পাঠদান। বিপরীতে আবদুল মজিদ কলেজের ছোট একটি দোতলা ভবনে রয়েছে একাডেমিক ভবন-২ (ল্যাবরেটরি)। আরও পশ্চিমে সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ভবনের চতুর্থ তলায় চলছে অন্য দুটি বিষয়ের পাঠদান।
শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য শান্তিগঞ্জ বাজার থেকে ডুংরিয়া গ্রামে যাওয়ার পথে সড়কের দুই পাশে দুটি ভবন ভাড়া করা হয়েছে। একটিতে ছাত্র, অন্যটিতে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা। ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১০০ ও ৭০ জন।
একজন শিক্ষার্থী বললেন, ‘এখানে একেক জায়গায় একেক ভবনে পাঠদান হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। যেখানেই হোক, দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস দরকার।’
উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন গত ২৮ জুলাই যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনেক সংকট ও সীমাবদ্ধতা আছে। তবে সুনামগঞ্জের মতো জায়গায় এ ধরনের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুবই জরুরি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করলেই হয় না। শিক্ষার্থীরা কোথায় পড়বেন, শিক্ষকেরা কোথায় পাঠদান ও গবেষণা করবেন, কীভাবে ব্যবহারিক শিক্ষা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও আগে থেকেই থাকা দরকার।
ছড়িয়ে থাকা তিন ভাড়া ভবন
সুনামগঞ্জের মতোই স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাবে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অস্থায়ী ব্যবস্থায় চলছে প্রযুক্তি খাতের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)। ৩০ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম তিনটি ভাড়া করা ভবনে ছড়িয়ে আছে।
এর মধ্যে একাডেমিক ভবন-২-এ অন্যান্য যানবাহন দূরের কথা, রিকশায় যাওয়াও কষ্টসাধ্য। তিনতলা নির্মাণাধীন ভবনটিতে তিনটি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম চলে। ভবনটি বাইরে থেকে আশপাশের সাধারণ বসতবাড়ির মতোই দেখতে। ভেতরে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী জানান, শিক্ষকেরা কেউ নেই; শিক্ষার্থীরা একটি খেলা দেখতে বাইরে গেছেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী অবশ্য পাওয়া গেল।
ফেনী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা বললেন, ক্লাস হয়, কিন্তু নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় নানা সমস্যা রয়েছে। এই ভবনে জেনারেটর নেই, বিদ্যুৎ চলে গেলে সমস্যা হয়।
একাডেমিক ভবন-২ থেকে কিছু দূরে প্রশাসনিক ভবন। এরপর অটোরিকশায় আরও বেশ খানিকটা দূর গেলে একাডেমিক ভবন-১। অটোরিকশায় ২০ টাকার মতো লাগল। পাঁচতলা এই ভবনটি একাডেমিক ভবন-২-এর তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও দুটির কোনোটিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললেই উঠে আসে নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকার আক্ষেপ।
ইউজিসি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর এই তাড়াহুড়োর পেছনে নিয়োগের নামে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়। ইতিমধ্যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
ইউএফটিবির আইন পাস হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। এরপর ২০১৮ সালের জুনে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্যে দুবার নাম পরিবর্তন হয়েছে। এ পর্যন্ত চারজন উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁদের দুজন মেয়াদ শেষ করতে পারেননি, একজন এক মেয়াদ শেষ করেছেন এবং আরেকজন সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার আট বছর পরেও নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চারটি অনুষদের পাঁচটি বিভাগে এখন শিক্ষার্থী ৯২৮ জন। শিক্ষক ৪১ জন। সবাই প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক; সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক নেই। এ ছাড়া কর্মকর্তা ৩৬ এবং কর্মচারী ৫২ জন। ইতিমধ্যে দুটি ব্যাচ পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়ে গেছেন।
ইন্টারনেট অব থিংস অ্যান্ড রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, যে ভিশন ও মিশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা, তার ৫ শতাংশও এখনো পূরণ হয়নি।
একাডেমিক ভবন-১ ঘুরে প্রশাসনিক ভবনে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আতাউর রহমান খানের সঙ্গে। তিনিও নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তবে জানান, পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৫০ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন, জমি অধিগ্রহণের টাকা এবং সীমানাপ্রাচীরসহ ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রক্রিয়াধীন।
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগেই হয়েছে এবং প্রায় সব কটিরই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এখন এগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়মকানুনের মধ্যে আনা এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৪টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষায়িত দক্ষ স্নাতক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক, সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার মতো বিষয় পড়ানো হচ্ছে।
নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ
শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর আগে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকলেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যেমন কয়েক বছর আগে অনুমোদন পাওয়া মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর তোড়জোড় চলছে। এর মধ্যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ অনুমোদনের জন্য ইউজিসির কাছে আবেদন করেছে।
সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে সরকার। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত। তিনি এর আগে গত ১৯ জুলাই গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
ইউজিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর জন্য উপাচার্য ইউজিসিতে চিঠি দিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে সব ধরনের বিষয় পড়াতে চাইলে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করলেই হয় না। শিক্ষার্থীরা কোথায় পড়বেন, শিক্ষকেরা কোথায় পাঠদান ও গবেষণা করবেন, কীভাবে ব্যবহারিক শিক্ষা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও আগে থেকেই থাকা দরকার।
ইউজিসি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর এই তাড়াহুড়োর পেছনে নিয়োগের নামে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়। ইতিমধ্যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
যেমন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন উপাচার্য অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি করে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়োগ দেন। সব মিলিয়ে উপাচার্য নিজের পরিবারের সদস্য-আত্মীয়দের মধ্যে নয়জনকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও পারেননি।
২০২৩ সালের মে মাসে ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের সভায় ‘নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পূর্বের নীতিমালা’ অনুমোদন করা হয়েছিল। নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল, নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাসের পরপরই ভাড়া করা বাড়ি বা অন্য কোনো অস্থায়ী স্থাপনায় যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ বন্ধ করা। কিন্তু এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় সাধারণ বিষয়
দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৪টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষায়িত দক্ষ স্নাতক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক, সমাজবিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার মতো বিষয় পড়ানো হচ্ছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। ফলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাইরের বিষয়ে পড়ছে।
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। সেখানে সাতটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাইরে ব্যবস্থাপনা, সমাজকর্ম ও ভূগোল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে সব ধরনের বিষয় পড়াতে চাইলে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপরীতে নিজেদের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কয়েকটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন বিভাগ খোলার অনুমোদন দেয় ইউজিসি। ফলে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজন ও লক্ষ্য বিবেচনা না করে বিভাগ খোলার প্রবণতার দায় ইউজিসির ওপরও বর্তায় বলে মনে করছেন অনেকে। শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও শৃঙ্খলা থাকা দরকার।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সমন্বিত আইন থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে এমন কোনো সমন্বিত আইন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন এবং জাতীয় সংসদে পাসের পর উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর তোড়জোড় শুরু হয়।
কেবলই নীতিমালা, বাস্তবায়ন নেই
ইউজিসির বর্তমান ও সাবেক দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আগে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রথমে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হতো। তখন ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হতো। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পরিবর্তিত নাম) প্রথমে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিয়ে প্রাথমিক কিছু কাজ করার পর উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১০-১২ বছর ধরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে আইন পাস হওয়ার পরপরই সরাসরি উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
২০২৩ সালের মে মাসে ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের সভায় ‘নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পূর্বের নীতিমালা’ অনুমোদন করা হয়েছিল। নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল, নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাসের পরপরই ভাড়া করা বাড়ি বা অন্য কোনো অস্থায়ী স্থাপনায় যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ বন্ধ করা। কিন্তু এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সৌমিত জয়দ্বীপ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকজনগণের টাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে, সেটি কেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই করতে হবে? পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে কয়েক বছর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নিজস্ব ক্যাম্পাস, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা উচিত। তা না হলে সেখানে আর যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।অপরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয়
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে ৬০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ১১৬টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষার্থী ৪৫ লাখের বেশি। জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন লাখের বেশি। এত বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়েও দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৫০০-এর তালিকায় নেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সমন্বিত আইন থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে এমন কোনো সমন্বিত আইন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন এবং জাতীয় সংসদে পাসের পর উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর তোড়জোড় শুরু হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদাহরণ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন থেকে বের করে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নামে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়। যদিও শুরুতেই নানা সমস্যা আর বিতর্কের মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম চলছে।
সাতটি জেলায় (মহানগর এলাকাসহ) অর্ধেকের বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে ৫টি, গাজীপুরে ৫টি, খুলনায় ৪টি, রাজশাহীতে ৩টি, সিলেটে ৩টি এবং ময়মনসিংহে ২টি। এ ছাড়া কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, যশোর, পাবনা, রংপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, রাঙামাটি, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, লালমনিরহাট, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ, পিরোজপুর, নওগাঁ, মেহেরপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লক্ষ্মীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে এসব এলাকার বেশ কয়েকটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের মতোই রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় অবস্থিত।
এ রকম পরিস্থিতিতে দেশে আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে কি না—এই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার প্রস্তুতি আছে কি না।
এভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাস ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাকে ‘পরিণত বয়সের আগেই শিশুর জন্মের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ড. সৌমিত জয়দ্বীপ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, জনগণের টাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে, সেটি কেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই করতে হবে? পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে কয়েক বছর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নিজস্ব ক্যাম্পাস, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা উচিত। তা না হলে সেখানে আর যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর সুনামগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক খলিল রহমান]