পুতিনকে থামানোর ট্রাম্পের নতুন মিশন সফল হবে কি
· Prothom Alo

হোয়াইট হাউসের দুই বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মস্কো ও কিয়েভ সফর অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার উত্তর এখনো অজানা। দুই দেশের বৈঠকেই ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ পায়নি; তবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষই আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে বর্ণনা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে এ সময়ে এসে থমকে যাওয়া আলোচনা নতুন করে শুরুর উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, রাশিয়ার অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হয়েছে।
Visit afnews.co.za for more information.
মস্কোর স্পষ্ট দাবি, ইউক্রেনকে প্রকৃতপক্ষে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হতে হবে, যেখানে প্রকাশ্যে বা গোপনে পশ্চিমা কোনো সামরিক উপস্থিতি থাকবে না। রাশিয়া তাদের দখল করা অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায় এবং দনবাস অঞ্চলের যে সামান্য অংশ এখনো ইউক্রেনের হাতে রয়ে গেছে, সেখান থেকেও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সরে যাওয়ার জোর তাগিদ দিচ্ছে।
এ ছাড়া ইউক্রেন সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ও অস্ত্রের ধরনের ওপর নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করতে চায় মস্কো। একই সঙ্গে অতি ডানপন্থী ও আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলোকে বিলুপ্ত ও নিষিদ্ধ করা, রুশ ভাষার ব্যবহার সীমিতকরণ আইন বাতিল করা এবং এমন নির্বাচনের আয়োজন করা দাবি করছে, যেখানে রাশিয়াবান্ধব দলগুলো প্রগতিশীল বা প্রো-ওয়েস্টার্ন দলগুলোর সঙ্গে অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।
ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় সমর্থকদের জন্য এ শর্তগুলো মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে পুরো গ্রীষ্মে তারা যেখানে নিজস্ব জনগণকে এবং ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ‘যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাচ্ছে’। প্রমাণ হিসেবে ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা বারবার তুলে ধরেছেন যে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ধীর হয়ে পড়েছে এবং ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরের তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে, যার ফলে রাশিয়াজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্প ও পুতিন কেন ভুলের ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন নারাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেনের সুবিধাজনক শর্তে শান্তিতে রাজি হতে বাধ্য করা। কিন্তু ফলাফল হয়েছে ঠিক উল্টো। মস্কো এখন আপসের বিষয়ে আরও বেশি অনমনীয়। একসময় দনবাস থেকে ইউক্রেনকে প্রত্যাহারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভূমির অদলবদলের যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি উধাও।
অন্যদিকে ক্রেমলিন ইউক্রেনের অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধসে দেওয়ার জন্য নিজস্ব ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ওদেসা বন্দরের মাধ্যমে ইউক্রেনের মূল রপ্তানি পণ্য শস্য ও আকরিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া দেশটির লজিস্টিক হাব, গুদাম এবং মেটালার্জিক্যাল ও পানীয় কারখানাগুলোয় সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
এমন এক জটিল মুহূর্তে ট্রাম্পের এই দুই শান্তিদূত আবারও দৃশ্যপটে হাজির হলেন। কুশনার ও উইটকফ এ সফরে সরাসরি পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন, যা ওয়াশিংটনের কৌশলে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
কিয়েভে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে স্বাগত জানান জেলেনস্কিতাঁদের আগমনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ রহস্যজনকভাবে মস্কো সফর করেন। কিন্তু সিআইএ প্রধানের গাড়িবহর ক্রেমলিনে পৌঁছালেও পুতিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে র্যাটক্লিফকে কেবল রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি ও এসভিআরের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেই দেশে ফিরতে হয়।
সন্দেহজনক কিছু সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গণমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা ছাড়া ওই বৈঠক থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু পাওয়া যায়নি। যুদ্ধবাজ বা চরমপন্থী কিছু গণমাধ্যম দাবি করেছিল, পূর্ব ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের ওপর হামলা না করার বিষয়ে রাশিয়াকে চরম সতর্কবার্তা দিতে গিয়েছিলেন র্যাটক্লিফ।
আবার কেউ দাবি করেছে, তিনি পুতিনের কাছে ইউক্রেনের ‘যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাওয়ার’ তথ্য তুলে ধরে নতুন করে আলোচনার পথ খুঁজছিলেন। ‘দ্য আটলান্টিক’ সাময়িকী তো দাবি করেছিল, গলফ খেলার সময় সিআইএ পরিচালকই ট্রাম্পের মাথায় ঢুকিয়েছিলেন যে রাশিয়া হারতে শুরু করেছে।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই শান্তি আলোচনায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি অর্জন করা এবং ইরানকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমাতে পুতিনকে রাজি করানো ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় হামলায় সরাসরি সাহায্য করে যাবে, ততক্ষণ এটি অর্জন করা অসম্ভব।
রুশ প্রবাসী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাজেন্টস্টভো’ ক্রেমলিনের এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, র্যাটক্লিফ তাঁর অধীন ব্যক্তিদের কাছে কী কথা বলছেন, তা শোনার পর পুতিন মনে করেন যে সিআইএ প্রধান বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন, আর সে কারণেই তিনি বৈঠকটি বাতিল করেছিলেন।
বিষয়টি যা–ই হোক না কেন, র্যাটক্লিফের মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেখানে পুতিনের কাছে পাত্তাই পাননি, সেখানে কুশনার ও উইটকফকে মস্কোয় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে এবং তাঁরা পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। এতেই পরিষ্কার যে ট্রাম্পের দুই দূত কেবল এমন কোনো গল্প শোনাতে মস্কো যাননি, যাকে পুতিন ‘পশ্চিমা অপপ্রচার’ বলে মনে করেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, উইটকফ ও কুশনারের এই সফর শান্তিপ্রক্রিয়ায় সত্যি কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনতে পেরেছে কি না। প্রতিনিধিরা সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, তাৎক্ষণিক কোনো বড় সাফল্য দৃশ্যমান না হলেও তারা রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পথ খুঁজছেন।
পুতিন এমন কিছু চান, যা তিনি কখনোই পাবেন নাপুতিন যে দুই জায়গায় ট্রাম্পকে পাত্তা দেন নাএ সফরের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনেক বিশেষজ্ঞই শুরু থেকেই এটিকে ব্যর্থ বলে ঘোষণার তাড়াহুড়া দেখাচ্ছেন। পশ্চিমা সমাজে যুদ্ধের ক্লান্তি বাড়লেও যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলো যে এখনো কতটা প্রভাবশালী, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ।
এই যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী যেকোনো মূল্যে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ করতে চায়—ঠিক যেমনটা তারা ২০২২ সালের বসন্তে ইস্তাম্বুল আলোচনা ভেস্তে দিয়েছিল কিংবা তারও আগে মিনস্ক চুক্তি বাতিল করেছিল।
শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে হলে ট্রাম্পকে এই যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীর মোকাবিলা করতে হবে, যার মধ্যে ইউরোপীয় সরকারগুলো, ন্যাটোর শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তার নিজের দেশের একটি বড় রাজনৈতিক গোষ্ঠীও রয়েছে।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই শান্তি আলোচনায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি অর্জন করা এবং ইরানকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমাতে পুতিনকে রাজি করানো ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় হামলায় সরাসরি সাহায্য করে যাবে, ততক্ষণ এটি অর্জন করা অসম্ভব।
এদিকে রাশিয়ার অব্যাহত ও নির্মম বোমাবর্ষণে ইউক্রেনের টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। শীতকাল যত ঘনিয়ে আসছে, জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোকে নিশানা করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।
কিয়েভ এমনিতেই রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত। জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যকার দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার ওপর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাজেটে ২৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা মেটাতে যে পশ্চিমা সহায়তার প্রয়োজন, তা আসার আর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নিজের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে একটি আত্মঘাতী যুদ্ধে ইউক্রেনকে ঠেলে দেওয়ার রাজনৈতিক চাপের হয়তো কোনো শেষ নেই; কিন্তু ইউক্রেনীয়রা নিজেদের ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো এজেন্ডার জন্য আর কত দিন জীবন দেবে—তার একটি নির্দিষ্ট সীমা নিশ্চয়ই আছে।
লিওনিদ রাগোজিন রিগায় বসবাসরত একজন স্বতন্ত্র সাংবাদিক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।