পবন ঝাউয়ের প্রাকৃতিক আবাস
· Prothom Alo

পবন ঝাউয়ের সঙ্গে সখ্য অন্তত ৪০ বছর আগে থেকে। তখন অবশ্য নাম জানতাম না। স্কুলে পড়ি। আমি আর আমার এক কাজিন উঠানের কিছু অংশ আলাদা করে বাগান করার কাজে মেতে উঠি। সেসব কাজের অংশ হিসেবে আমাদের বাড়ি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত সংযোগ সড়কের দুই পাশে ৩০টির মতো গাছ লাগিয়েছিলাম। কয়েক বছরের মধ্যে গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠল। তারও একটা কারণ আছে। মাটি ছিল একেবারেই নতুন। ১৯৬৭ সালে আব্বা আমাদের পুরোনো বাড়ির সামনে নতুন বাড়িটি তৈরির কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সাল থেকে আমরা নতুন বাড়িতে বসবাস শুরু করি। শুনেছি, তখন দুজন লোকের কাজই ছিল সারা দিন বাড়ির চারপাশে গাছ লাগানো। অবশ্য ঝাউগাছ লাগানো হয় আরও অনেক বছর পর, ১৯৮৫ সালের দিকে। তারপরের ঘটনা বেশ মজার। তত দিনে গাছগুলো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই।
একদিন বিকেলে বাড়ির উঠানে সবাই গল্প করছি। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ। আমরা হকচকিয়ে পরস্পরের দিকে তাকাই। আকাশে তাকাই। আকাশ পরিষ্কার। তাহলে বাতাসে ঝড়ের মতো শব্দ কেন? পরে অবশ্য আমরা এই শব্দের উৎস খুঁজে পাই। সামান্য বাতাসেই ঝাউগাছে এমন শব্দ হয়। গ্রামের মানুষ এ জন্য গাছটিকে ‘পোবন’ গাছ নামে ডাকে। পোবন মানে পবন বা বাতাস। বাতাসে এমন শব্দ হয় বলেই সম্ভবত এমন নামকরণ।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
গ্রাম থেকে এমন একটি চমৎকার নাম পেয়ে আমি অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাকে প্রস্তাব করি, গাছটির নাম বিলাতি ঝাউয়ের পরিবর্তে ‘পবন ঝাউ’ হলে কেমন হয়। তাঁকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বোঝালাম। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। তখন থেকে গাছটির নাম পবন ঝাউ। নামটি তিনি শ্যামলী নিসর্গ–এর সর্বশেষ সংস্করণেও ব্যবহার করেছেন। একসময় গাছটি বিলাতি ঝাউ নামেই পরিচিত ছিল। উপকূলীয় জেলা ও সাগরপাড়ে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া সারা দেশেই বিক্ষিপ্তভাবে চোখে পড়ে। পাইনগাছের সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে।
২০২৫ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বেপজার (বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ) সীমানাদেয়াল লাগোয়া ইছাখালী এলাকায় প্রাকৃতিক আবাসে অসংখ্য পবন ঝাউ দেখে রীতিমতো চমকে উঠি। আমরা সাধারণত এ গাছকে আবাদিত হিসেবেই জানি। কিন্তু বীজ থেকে চারা হয়ে তা আবার জোয়ার–ভাটার পানিতে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দিব্যি বুনো পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে! চমকপ্রদ ঘটনা বটে।
শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থে বিজ্ঞান লেখক ও বরেণ্য নিসর্গী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, ‘বিলাতি ঝাউগাছের সঙ্গে পাইনের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্যের জন্য একে পাইন গোত্রের কোনো প্রজাতি বলে ভুল করা অসম্ভব নয়। ফলক, ফল, স্বনন—সবই তো পাইনের মতো। অথচ বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে ঝাউ কিংবা পাইনের সঙ্গে তার কোনো আত্মীয়তা নেই। শ্রেণিনির্ণয়তত্ত্বের জটিল নিয়মে এই সাদৃশ্য গুরুত্বহীন। পাইন, ঝাউ নগ্নবীজ উদ্ভিদ আর বিলাতি ঝাউ হলো আম কিংবা বকুলের মতোই আবৃতবীজ। এসব পার্থক্য এতই মৌলিক যে বিবর্তনের সিঁড়িতে পাইনের স্থান বিলাতি ঝাউয়ের অনেক নিচে।’
পরিণত পবন ঝাউ (Casuarina equisetifolia) সুউচ্চ, সরল ও দীর্ঘাকৃতির বৃক্ষ। ৬ থেকে ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। অপেক্ষাকৃত নবীন গাছ পিরামিডাকৃতির। কাণ্ড ধূসর, রুক্ষ ও অমসৃণ। পাতাগুলো অদৃশ্যপ্রায় বাদামি রঙের বিবর্ণ রোমে রূপান্তরিত। ফুল অত্যন্ত ছোট এবং জৌলুশহীন। স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা মঞ্জরিতে থাকে। গ্রীষ্মের শুরু ও হেমন্তের শেষেÑমোট দুবার ফুল ফোটে। বীজ অত্যন্ত হালকা ও বাদামি।
এ গাছের কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বালুভূমির প্রসার রোধে বিলাতি ঝাউয়ের বলয় খুব কার্যকর। আলংকারিক হিসেবে পথপাশ, উদ্যান ও বাড়ির প্রাঙ্গণের জন্য পবন ঝাউ আদর্শ।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক