৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙনের মুখে, আতঙ্কে ৩০ হাজার পরিবার

· Prothom Alo

একসময় সচ্ছল পরিবার ছিল সত্তরোর্ধ্ব মোস্তফা মুসল্লীর। স্ত্রী ও ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে বরগুনার বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকায় নিজের ভিটেমাটিতে বসবাস করতেন। জমিজমা ছিল প্রায় পাঁচ বিঘা। বিষখালী নদীর ভাঙনে দুই বছর আগে তাঁর ভিটেমাটি বিলীন হয়েছে। এরপর ঠাঁই নেন কালিকাবাড়ি লঞ্চঘাটের পাশে খাসজমিতে। সেই বাড়িও ছয় মাস আগে ভাঙনে নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে একই এলাকার অন্য এক ব্যক্তির বাড়িতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। সব জমি হারিয়ে এখন কী করবেন, সেই চিন্তায় আছেন।

Visit biznow.biz for more information.

মোস্তফার মতো বেতাগী উপজেলার সরিষামুড়ী ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি এলাকায় গত ছয় মাসে ৫০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। আর গত এক বছরে বিলীন হয়েছে শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি।

বরগুনার পায়রা ও বিষখালী নদী এবং বলেশ্বর নদের ভাঙনে জেলার সাড়ে ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে বাঁধের আশপাশে থাকা ৩০ হাজার পরিবারের লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে আছেন।

বিষখালী নদীর ভাঙনের মুখে বেড়িবাঁধ। ২০ অক্টোবর পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা এলাকায়

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বরগুনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে নদ-নদীর অব্যাহত ভাঙন ও উচ্চ জোয়ারের বর্তমানে ৭২ দশমিক ৫০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলার ২৬ দশমিক ৯৪৯ কিলোমিটার, পাথরঘাটার ১৮ দশমিক ৫৫৯ কিলোমিটার, বেতাগীর ১১ দশমিক ১৬৬ কিলোমিটার, আমতলীর ৫ কিলোমিটার, তালতলীর ৩ দশমিক ৫০০ কিলোমিটার ও বামনা উপজেলার ৭ দশমিক ৩২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে।

বেড়িবাঁধের ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে জেলার তিনটি উপজেলায় তিন দিন সরেজমিন করেছে প্রথম আলো। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বামনা উপজেলার দক্ষিণ রামনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেড়িবাঁধের একটি অংশ বিষখালী নদীর গর্ভে চলে গেছে।

১০ অক্টোবর বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনের মুখে রয়েছে ৮৮ বছরের পুরোনো কালিকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি রক্ষার জন্য ভাঙনস্থলে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।

মো. রাজু মিয়া, বাসিন্দা, কালমেঘা গ্রাম, পাথরঘাটা বর্তমানে অবশিষ্ট ৪০ শতক জমিতে বাড়ি করে আছি। সেটাও কখন বিষখালী নদী গিলে খাবে বলা যায় না।

২০ অক্টোবর পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ ভেঙে বিষখালী নদীতে চলে গেছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এমন অবস্থায় স্রোতের তোড়ে বেড়িবাঁধ ভাঙন অব্যাহত আছে।

২০০৭ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে পাথরঘাটার বলেশ্বর নদের তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় দুই দশকেও সেখানে টেকসই বাঁধ নির্মাণ হয়নি। এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নদীভাঙনে তাঁরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাঁদের জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্য মজবুত বাঁধ দরকার।

পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা গ্রামের বাসিন্দা মো. রাজু মিয়া। বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে তাঁর ঘরবাড়ি ও ১৬ একর জমিজমা বিলীন হয়েছে। রাজু মিয়া বলেন, ‘বর্তমানে অবশিষ্ট ৪০ শতক জমিতে বাড়ি করে আছি। সেটাও কখন বিষখালী নদী গিলে খাবে বলা যায় না।’

বিষখালী নদীর ভাঙনের মুখে বেড়িবাঁধ। ১০ অক্টোবর বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি এলাকায়

পাউবো সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের প্রতি কিলোমিটারে টেকসই ব্লকবাঁধ নির্মাণের জন্য ৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে ৭২ কিলোমিটার ব্লকবাঁধ নির্মাণে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা এবং জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন।

পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হান্নান প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ভাঙনকবলিত স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তীর সুরক্ষার কাজ করার জন্য ঢাকায় প্রস্তাব পাঠানো হবে।

Read full story at source