ভিক্টোরিয়ান নারীর লম্বা চুলের সংস্কৃতি
· Prothom Alo

অতীতকে পাঠ করার নানা উপায় আছে। কখনো তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে; আবার কখনো এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি আমরা হই, যার সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে ধারণ করে একটি মাত্র আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহুস্তর গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব তেমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
Visit mwafrika.life for more information.
উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত সময়কে গণনা করা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩৭-১৯০১) হিসেবে। যুগটি যেমন ছিল অনমনীয় সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের, তেমন ছিল জটিল নৈতিক বিধিনিষেধের। এই সময়সীমায় নারীর শরীরকে গৃহস্থালি গুণের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। যদি বলা হয়, মানুষজন এমনভাবে দেখতে আসক্ত ছিল, তাহলেও ভুল হবে না। তৎকালীন সংস্কৃতিতে নারীর চুল ছিল তেমন এক বৈশিষ্ট্য, যা অসাধারণ গুরুত্ব বহন করত। ১৮৬০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে লম্বা চুলের প্রতি সামাজিক ভক্তি (কাল্ট অব লং হেয়ার) চরমে পৌঁছায়। নারীর সাধারণ চুল তখন আর শুধু সাধারণ বাস্তবতা নয়, তা হয়ে ওঠে নারীত্ব, সুস্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার এক গভীর প্রকাশ।
ভিক্টোরিয়ান নারীদের কাছে চুল কখনোই কেবল চুল ছিল না; এটি ছিল তার মুকুটের গৌরব হিসেবে। এমন একটি ধারণা, যা মূলত ধর্মীয় সূত্র থেকে আসে। লম্বা চুলকে দেখা হতো ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে। তবে তা পরবর্তী সময়ে সাধারণ সমাজে নারীত্বের সর্বোচ্চ অলংকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ভিক্টোরিয়ান নারীদের কাছে চুল হয়ে ওঠে একই সঙ্গে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। জীবনে কখনো চুল না কাটা শুধু ফ্যাশনের বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি। অনেক নারী চুল না কাটার মাধ্যমে নিজেকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শে সমর্পণ করত, যা প্রকাশ করত তাদের অসীম ধৈর্য, শ্রম ও সামাজিক নিয়মের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য।
আলোকচিত্র: লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানি/লাইব্রেরি অব কংগ্রেসচুলের প্রতি এমন আসক্তির নান্দনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে রোমান্টিক আন্দোলনের প্রভাবে। ‘রোমান্টিক আন্দোলন’ মানুষের অনুভূতি, কল্পনা, প্রকৃতি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেয়। যেখানে আগের যুগে যুক্তি ও নিয়ম প্রধান ছিল, সেখানে রোমান্টিকরা বললেন, মানুষকে বুঝতে হলে তার হৃদয়কে বুঝতে হবে। রোমান্টিক আন্দোলনের পরবর্তীকালে প্রি-রাফায়েলাইট শিল্পীদের মাধ্যমে তা আরও শক্তিশালী হয়। প্রি-রাফায়েলাইট শিল্পী যেমন, দান্তে গ্যাব্রিয়েল রসেটি ও জন এভারেট মিলেইসের মতো শিল্পীরা তাঁদের চিত্রকর্মে নারীদের দেখাতেন ঢেউ খেলানো, খোলা ও দীর্ঘ চুলে। তাঁদের শিল্পকর্মে চুল এমনভাবে ফুটে উঠত, যেন সেই চুলের নিজস্ব একটি প্রাণ আছে। তাঁদের আঁকা চুল কখনো সোনালি, কখনো লালচে, কখনো গভীর কালো হয়ে প্রকাশ পায়। সেখানে চুল এমনভাবে কাঁধ বেয়ে নেমে আসত যে তা হয়ে উঠত এক স্বপ্নময় সৌন্দর্যের প্রতীক। যদিও এসব নারীচিত্র অনেক সময় পৌরাণিক বা সাহিত্যিক চরিত্র ছিল, তবু সাধারণ মানুষের মনে সেসব গভীর প্রভাব ফেলে।
আলোকচিত্র: লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানি/লাইব্রেরি অব কংগ্রেসঅন্যদিকে লম্বা ও ঘন চুল তখন নারীর প্রাণশক্তি ও সন্তান ধারণক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। সেই সময়ে যখন শিশুমৃত্যুর হার বেশি ছিল এবং যক্ষ্মার মতো রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সুস্থ ও ঘন চুলকে ধরা হতো সুস্বাস্থ্যের দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে। বিপরীতে পাতলা বা ছোট চুলকে প্রায়ই অসুস্থতার লক্ষণ মনে করা হতো। যেমন টাইফাসের মতো রোগে (একধরনের সংক্রামক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, সাধারণত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে ছড়ায়) নারীদের মাথা কামিয়ে ফেলা হতো জ্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য। তাই চুল না কাটা ছিল নিঃশব্দে নিজের সুস্বাস্থ্য ও শক্তির ঘোষণা।
এত লম্বা চুলের যত্ন নেওয়া ছিল কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ, যা আজকের দিনে কল্পনা করা কঠিন। তখন ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ ছিল না, এমনকি ছিল না আধুনিক শ্যাম্পু। ফলে চুল ধোয়া হতো মাসে একবার কিংবা দুবার। ব্যবহার হতো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেক সময় ডিমের সাদা অংশ, মিশ্রিত অ্যামোনিয়া বা বিশেষ গুঁড়া ব্যবহার করা হতো চুল পরিষ্কার করতে। লম্বা চুল শুকাতে লাগত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নারীরা আগুনের পাশে বা রোদে চুল ছড়িয়ে বসে শুকাতেন। প্রতিদিনের যত্নে ছিল অসংখ্যবার আঁচড়ানোর নিয়ম। বিশাল চিরুনি দিয়ে আঁচড়িয়ে মাথার তেল চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হতো। নারীদের গৃহস্থালি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছিল চুলের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
ফ্লেচার সাদারল্যান্ড এবং তাঁর কন্যারা্স—সেভেন সাদারল্যান্ড সিস্টার্স, ১৯০০।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লম্বা চুলের প্রতি আকর্ষণ ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে জনসমক্ষে প্রদর্শনের বিষয় হয়ে ওঠে। এই প্রবণতার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ‘সেভেন সাদারল্যান্ড সিস্টার্স’। আমেরিকার একটি সংগীতদল, যারা মূলত তাদের চুলের জন্যই খ্যাতি অর্জন করেছিল। তাদের চুলের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ৩৭ ফুট! যদিও তারা সার্কাসে গান গাইত, কিন্তু দর্শক আসত তাদের চুল দেখতে। পরবর্তীকালে তারা চুল বাড়ানোর তেল ও ওষুধ বিক্রি করে বিশাল ব্যবসা গড়ে তোলে। তারা ছিল সেই সময়ের ইনফ্লুয়েন্সার, যারা নারীদের মনে এই ধারণা আরও দৃঢ় করে তোলে যে সৌন্দর্য ও মূল্য অনেকটাই নির্ভর করে চুলের ওপর।
তবে চুল নিয়ে সামাজিক নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠোর। ব্যক্তিগত ও জনসমক্ষে চুলের ব্যবহারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। সাধারণভাবে ভদ্র নারীদের খোলা চুলে বাইরে বের হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হতো। সে সময় খোলা চুলকে মনে করা হতো উচ্ছৃঙ্খলতা ও অশালীনতার প্রতীক। সাধারণত ১৬ বছর বয়সের পর থেকেই নারীদের চুল খোঁপা বা বেণিতে বাঁধা বাধ্যতামূলক হয়ে যেত, যা ছিল একধরনের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার চিহ্ন।
লম্বা চুলের তেলের বিজ্ঞাপন, ১৮৯০এত লম্বা চুল সামলাতে ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন পিন, চিরুনি, এমনকি নিজের ঝরে পড়া চুল দিয়ে তৈরি ছোট প্যাড, যাকে বলা হতো ‘র্যাটস’, যা চুলকে আরও ঘন দেখাতে সাহায্য করত। ভারী পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এই বাড়তি ভলিউম দরকারি মনে করা হতো।
চুলের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একধরনের নৈতিকতা। একজন নারীর চুল ছিল তার ব্যক্তিগত সীমারেখা। রাতে শোবার আগে চুল খোলা হতো, আর সকালে প্রথম কাজ ছিল তা বেঁধে ফেলা। স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সামনে খোলা চুলে দেখা দেওয়া ছিল চরম অশোভন। এই গোপনীয়তা চুলকে এক রহস্যময় আকর্ষণ দিয়েছিল। সাহিত্যেও চুলকে প্রায়ই ভালোবাসা, আকর্ষণ ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
যে নারী কখনো চুল কাটতেন না, তাঁকে মনে করা হতো ঐতিহ্য ও শালীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু শতাব্দীর শেষে এসে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। ‘গিবসন গার্ল’ নামে এক নতুন আদর্শ জনপ্রিয় হয়, যেখানে চুল এখনো বড়, কিন্তু তা আরও হালকা ও উঁচু স্টাইলে বাঁধা হয়, যা নারীর স্বাধীনতার এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করত।
আলোকচিত্র: লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানি/লাইব্রেরি অব কংগ্রেসশেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই ধারা ভেঙে দেয়। যখন নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন এত লম্বা চুল রাখা হয়ে ওঠে বিপজ্জনক ও অপ্রয়োজনীয়। কারখানার যন্ত্রের সঙ্গে লম্বা চুল ছিল প্রাণঘাতী ঝুঁকি। ফলে ১৯২০-এর দশকে ছোট চুল বা ‘বব কাট’ শুধু ফ্যাশন নয়, বরং ভিক্টোরিয়ান যুগের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়।
ভিক্টোরিয়ান নারীদের জন্য চুল ছিল এক নীরব ভাষা, যা তাদের স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থান ও জীবনদর্শনের প্রতিফলন। তাদের মাথার ভারী চুল শুধু শারীরিক বিষয় ছিল না, তা ছিল সেই সময়ের নারীদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। আজ সেই ছবিগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখি এক ভিন্ন সময়ের সৌন্দর্যবোধ, যেখানে ধীরতা, শৃঙ্খলা ও অলংকরণই ছিল নারীর প্রধান মূল্য।
‘লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানি’ ভিক্টোরিয়ান নারীদের চুলের সৌন্দর্যধারাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তারা আলোকচিত্রের মাধ্যমে নারীদের এই সৌন্দর্যকে ধারণ করে রেখেছিল। আলোকচিত্র ধারণ করতে তারা ব্যবহার করত স্টেরিওস্কোপ। এটি এমন একটি যন্ত্র, যা আলোকচিত্রে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) অনুভূতি দিত।
আলোকচিত্র: লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানি/লাইব্রেরি অব কংগ্রেসআলোকচিত্রগুলো কেবল স্টেরিওস্কোপে ধারণ করা কিছু পোর্ট্রেট ছিল না; এগুলো ভিক্টোরিয়ান যুগের একধরনের প্রকাশমাধ্যম। ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’ আজও এই অ্যালবুমেন প্রিন্টগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছে। ফলে আমরা জানতে পারি, অনেক নারী তাদের চুলকেই কীভাবে পেশায় পরিণত করেছিলেন।
তাদের সংরক্ষণের সবচেয়ে বিখ্যাত আলোকচিত্রটি হচ্ছে ‘সেভেন সাদারল্যান্ড সিস্টার্স’। নারীদের মোট ৩৭ ফুট চুলের দৈর্ঘ্য সারা বিশ্বে এক বিস্ময় হয়ে উঠেছিল। তাদের ছবিগুলো একদিকে যেমন সৌন্দর্যের আদর্শ হিসেবে নিদর্শন তৈরি করত, অন্যদিকে তেমনি হয়ে উঠেছিল চুলের তেল ও প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন।
যখন কোনো নারী খোলা চুলে আলোকচিত্রীর সামনে দাঁড়াতেন, তখন সেটি ছিল একধরনের কোমলতা ও প্রদর্শনের প্রকাশ। প্রি-রাফায়েলাইট শিল্পধারার প্রভাবে, যা সে সময়ের আলোকচিত্রেও গভীর ছাপ ফেলেছিল। ঢেউখেলানো লম্বা চুলকে দেখা হতো প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগের প্রতীক হিসেবে। একই সঙ্গে দেখা হতো যান্ত্রিক ও কঠোর আধুনিকতার বিরুদ্ধে নীরব এক প্রতিবাদ হিসেবে।
সাধারণ ভিক্টোরিয়ান নারীদের কাছে আলোকচিত্রগুলো একধরনের আকাঙ্ক্ষিত আদর্শে পরিণত হয়। তাঁরা রীতিমতো তা অর্জন করার স্বপ্ন দেখতেন। শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে যখন ‘নিউ ওম্যান’ ধারণার উত্থান ঘটে, তখন ধীরে ধীরে এই দীর্ঘ চুলের জায়গা নিতে শুরু করে আরও ব্যবহারিক ও সহজ হেয়ারস্টাইল। তবু লন্ডন স্টেরিওস্কোপিক কোম্পানির সংরক্ষিত ছবিগুলো আজও সাক্ষ্য দেয় এমন এক সময়ের, যখন একজন নারীর পরিচয় নির্ধারণে তার চুলই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।