পেশাগত সক্ষমতা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি করতে হবে
· Prothom Alo

২২ মে শুক্রবার সিলেটে মাদক ব্যবসায়ীর ছুরিকাঘাতে র্যাব সদস্য ইমন আচার্যের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনারই উদ্বেগজনক চিত্র। যে বাহিনীর দায়িত্ব মাদক, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন করা, সেই বাহিনীর সদস্যরাই যখন প্রকাশ্যে হামলার শিকার হন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
বিগত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও র্যাবের ওপর ধারাবাহিক হামলার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। শুধু মে মাসেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক হামলায় আহত হয়েছেন বহু পুলিশ ও র্যাব সদস্য। কোথাও মাদক কারবারিদের হাতে, কোথাও ডাকাত দলের আক্রমণে, আবার কোথাও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যত অসহায় অবস্থায় পড়েছে। এসব ঘটনা শুধু অপরাধীদের বেপরোয়া মানসিকতাই প্রকাশ করে না, বরং এটিও বোঝায় যে অপরাধীরা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আর আগের মতো ভয় পাচ্ছে না। রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক সংকেত আর কী হতে পারে?
Visit newsbetting.bond for more information.
এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, ২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা, অস্ত্র লুট ও পুলিশ সদস্যদের ওপর বাছবিচারহীন আক্রমণের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বহু পুলিশ সদস্য মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিশোধ, বদলি, মামলা কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ভুগেছেন। ফলে বাহিনীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকলে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর হতে পারে না। সরকারপ্রধান অপরাধ দমনে দলমত–নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে বহু থানায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের অনাপত্তি ছাড়া মামলা পর্যন্ত নেওয়া যায় না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে পুলিশের একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতা ও দ্বিধার মধ্যে কাজ করছে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।
তৃতীয়ত, বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা ও প্রস্তুতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ অস্ত্রধারী বা সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সুরক্ষা ছাড়া সদস্যদের পাঠানো হলে হতাহতের ঝুঁকি বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য বা কৌশলগত প্রস্তুতি ছাড়াই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেরাই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
এ অবস্থায় কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংস্কার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাব থেকে মুক্তভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাহিনীর সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। থানাভিত্তিক জনসম্পৃক্ততা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে অপরাধীদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে ওঠার আগেই প্রতিরোধ করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। একটি বাহিনী যদি জনগণের সহযোগিতা ও বিশ্বাস হারায়, তবে তার কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আবার জনগণও যদি মনে করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ দ্বিধাগ্রস্ত, তবে সমাজে আইনের শাসনের বদলে ভয় ও অনিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কেবল অস্ত্রের শক্তিতে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির ওপর। র্যাবের ইমন আচার্যের মৃত্যু সেই বাস্তবতাই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রয়োজন ঘটনাগুলোকে সাময়িক উত্তেজনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।