মানুষ কি গাছপালার ছত্রাক থেকে সংক্রমিত হতে পারে

· Prothom Alo

কয়েক দশক ধরে সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলোয় একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়। সেটি হলো, মানুষ গাছপালার মারাত্মক সব রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে। এর ফলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, মারা যাচ্ছে কিংবা জম্বিতে পরিণত হচ্ছে। কাল্পনিক এ ধারণার পেছনে কি আসলেই কোনো সত্যতা আছে? গাছের ক্ষতিকারক জীবাণুগুলো কি সত্যি মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং আমাদের আক্রান্ত করতে পারে?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বিজ্ঞানীরা এ প্রশ্নের যে উত্তর দিয়েছেন, তা এককথায় কিছুটা ভয় জাগানো। উত্তরটি হলো, হ্যাঁ, গাছের রোগজীবাণু মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

গাছের রোগজীবাণু আসলে কী? এগুলো হলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ফাঙ্গাস। এরা গাছের কোষে আক্রমণ করে। গাছের শরীর থেকে পুষ্টি শুষে খায় এরা। ঠিক যেমন আমাদের অসুখ হলে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি, জীবাণুর আক্রমণে গাছও তেমনি ঝিমিয়ে পড়ে। অনেক সময় গাছের পাতা রং হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে যায় এবং একপর্যায়ে গাছটি মারাই যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, গাছের যত ধরনের রোগ হয়, তার মধ্যে প্রায় ৮৫ ভাগ রোগের পেছনেই দায়ী এই ছত্রাক বা ফাঙ্গাস।

পারমাণবিক বিপর্যয় হলে কেন সূর্যমুখীর গাছ লাগানো হয়

আমাদের শরীর যেভাবে কাজ করে, তাতে গাছের রোগজীবাণুগুলো আমাদের সহজে আক্রমণ করতে পারে না। গাছ আর মানুষের শরীরের ভেতরের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। আর এ বিশাল পার্থক্যের কারণেই গাছের রোগ মানুষের শরীরে ছড়ানো বা মানুষের রোগ গাছে যাওয়াটা একদম ঘটে না বললেই চলে।

আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে কোষের গঠনে। গাছের কোষের চারপাশে সেলুলোজ দিয়ে তৈরি খুব শক্ত আর পুরু একটা দেয়াল থাকে। গাছের জীবাণুগুলো বছরের পর বছর ধরে নিজেদের তৈরি করেছে কেবল গাছের ওই শক্ত দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকার জন্য।

অন্যদিকে, মানুষের কোষের চারপাশে কিন্তু এমন শক্ত দেয়াল থাকে না। তার বদলে থাকে চর্বির একটা পাতলা স্তর। এই পর্দার ওপর আবার পাহারাদারের মতো কিছু বিশেষ প্রোটিন থাকে। কোনো ক্ষতিকর উপাদান দেখলেই এরা ঝটপট শরীরের রোগ প্রতিরোধ বাহিনীকে সজাগ করে তোলে। গাছের জীবাণুগুলো মানুষের কোষের এই প্রতিরোধকে ফাঁকি দিতে পারে না।

এর পাশাপাশি আরেকটি বড় বাধা হলো তাপমাত্রা। উদ্ভিদের বেশির ভাগ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া সাধারণত ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের শরীরের গড় তাপমাত্রা এদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক বেশি গরম। এ অতিরিক্ত তাপ উদ্ভিদের জীবাণুর ভেতরের প্রোটিনের গঠনকে ভেঙে দেয়, যার ফলে এরা আমাদের শরীরে কোনো সংক্রমণ বা রোগ ছড়াতে পারে না।

মস্তিষ্ক নেই, তবু গাছ কীভাবে মনে রাখে

তবে এই চেনা নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও দেখা যায়। ২০২৩ সালে কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের পরামর্শক অণুজীববিজ্ঞানী উজ্জ্বলীনী রায় ও সোমা দত্ত এমন এক রোগীর ঘটনা প্রকাশ করেন, যাঁর কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কাশি, গলাব্যথা ও খাবার গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। একপর্যায়ে তিনি খাওয়াদাওয়াই বন্ধ করে দেন। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁর শ্বাসনালির পাশে একটি পুঁজভর্তি ফোড়া দেখতে পান। ল্যাব টেস্টে সেই ফোড়ার পুঁজে কন্ড্রোস্টেরিয়াম পারপিউরিয়াম নামের ছত্রাকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ ছত্রাক সাধারণত গাছের পাতা রুপালি হয়ে যাওয়া রোগের জন্য দায়ী।

গবেষণায় জানা যায়, ৬১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি একজন উদ্ভিদ ছত্রাকবিজ্ঞানী বা প্ল্যান্ট মাইকোলজিস্ট ছিলেন। পেশাগত কারণে বছরের পর বছর ধরে পচনশীল কাঠ, মাশরুম এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের ছত্রাক নিয়ে খুব কাছ থেকে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এ ছত্রাকের স্পোর তাঁর শরীরে প্রবেশ করার পথ তৈরি হয়। চিকিৎসকদের ধারণা, স্পোরগুলো কোনোভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়া ফ্যাগোসাইটোসিস থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ফলে এগুলো শরীরের ভেতরে বংশবৃদ্ধি করে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই শীতল আবহাওয়ার ছত্রাক কীভাবে নরদেহের উচ্চ তাপমাত্রায় টিকে থাকল, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো একটি বড় রহস্য।

পরবর্তীকালে অ্যান্টিফাঙ্গাল ট্যাবলেট খেয়ে ওই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে সব ক্ষেত্রে ফলাফল এমন ভালো হয় না। যখন উদ্ভিদের কোনো রোগজীবাণু মানুষের শরীরে ছড়ায়, তখন সাধারণত দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই বেশি আক্রান্ত হন এবং এতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এসব জীবাণু উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। অনেক সময় হাসপাতালের ক্যাথেটার বা শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্রপাতির ভেতরেও এদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

এখন পর্যন্ত সব গবেষণা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মক দুর্বল নয়, তাঁদের কোনো ভয় নেই। উদ্ভিদের ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস তাঁদের আক্রান্ত করতে পারে না বললেই চলে। এ ধরনের সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। উদ্ভিদের জীবাণু থেকে আমাদের বাঁচানোর সবচেয়ে বড় দেয়াল হলো আমাদের শরীরের তাপমাত্রা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এ সুবিধা আমরা হারাতে পারি। পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়বে, উদ্ভিদের রোগজীবাণুগুলোও তত বেশি গরম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখবে। আর এই অভ্যস্ততাই এদের মানুষের শরীরের উচ্চতাপমাত্রায় বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করে তুলতে পারে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্সবৃক্ষমেলার বিচিত্র গাছ

Read full story at source