অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা জরুরি
· Prothom Alo

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সাম্প্রতিক অভিযান আমাদের সামনে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে আবারও তুলে ধরেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে আট প্রজাতির ৪২টি দেশীয় বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে এবং অবৈধভাবে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও বেচাকেনার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজধনেশ, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, পাহাড়ি কচ্ছপ, টিয়া, ময়না, সাদা প্যাঁচা ও গন্ধগোকুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বন্য প্রাণী উদ্ধার, পাচারকারী গ্রেপ্তার এবং অবৈধ বাণিজ্যচক্রের সন্ধান পাওয়ার খবর প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অভিযান ও উদ্ধার তৎপরতার পরও কেন এই অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না?
Visit moryak.biz for more information.
উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে চশমাপরা হনুমান ও লজ্জাবতী বানরের মতো প্রজাতি বিশেষভাবে সংরক্ষণযোগ্য। এ ধরনের প্রাণীকে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়; বরং বাস্তুতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর। একটি বন বা প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি প্রজাতি কমে গেলে বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে তার প্রভাব পুরো পরিবেশব্যবস্থার ওপর পড়ে।
বাংলাদেশে বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন–২০১২ রয়েছে। এই আইনে বন্য প্রাণী শিকার, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানও আছে। তবু বাস্তবে দেখা যায়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়লেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, আবার অনেক সময় শাস্তির নজিরও খুব বেশি দেখা যায় না। ফলে অপরাধ চক্রগুলো ঝুঁকি নিয়েই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
অনেক মানুষ এখনো মনে করেন, বন্য পাখি বা বানর ঘরে পোষা একটি শখ কিংবা মর্যাদার বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রায়ই দেখা যায়, কেউ কেউ বন্য প্রাণীকে পোষা প্রাণী হিসেবে প্রদর্শন করছেন। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। মানুষকে বুঝতে হবে, বন্য প্রাণীর স্থান খাঁচায় বা ঘরের কোণে নয়; তাদের স্থান প্রকৃতির মধ্যে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজার, বাস ও রেলস্টেশন এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। কারণ, এখন বন্য প্রাণী বেচাকেনার একটি বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমেও সংঘটিত হচ্ছে।
বন্য প্রাণী পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে নয়; বরং দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন হিসেবে দেখতে হবে। তাহলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রচেষ্টা সত্যিকার অর্থে সফল হবে।