রক্তের নয়, মমতার সম্পর্কে বাঁধা এক মা
· Prothom Alo

রক্তের সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু মমতার সম্পর্ক নয়। যাঁদের আপন বলে কেউ নেই, তাঁদেরই ‘মা’ হয়ে বেঁচে আছেন রাজেকা রহমান। এই পথ বেছে নিতে তাঁকে দিতে হয়েছে চড়া মূল্য—স্বামীর তালাক, পরিবারের অপমান, সমাজের তিরস্কার, এমনকি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও।
গলার সোনার চেইন, কানের দুল আর হাতের চুড়ি বিক্রি করে জমি কিনে বৃদ্ধাশ্রমের নামে লিখে দিয়েছিলেন রাজেকা। সেই এক সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে কয়েক শ অসহায় মানুষের জীবন। গত ৯ বছরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছেন দুই শতাধিক অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। কেউ ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে, কেউ শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তাঁর স্নেহের ছায়ায়। আর রাজেকা? তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, মানবসেবার মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি। তাই প্রতিদিন নিজের হাতে তাঁদের খাবার তুলে দেন, সেবা করেন নিজের মা–বাবার মতো। ৯ বছরের এই নিরলস পথচলা শুধু একজন নারীর সংগ্রামের গল্প নয়; এটি মানবতা, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক জীবন্ত দলিল।
Visit xsportfeed.life for more information.
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চৌধুরানী বাজারের পাশে গড়ে ওঠা দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র এখন রাজেকা রহমানের ঠিকানা। এখানে বসবাসকারী অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাই তাঁর পরিবার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁদের নিয়েই তাঁর ব্যস্ততা। কেউ অসুস্থ হলে পাশে থাকেন, কেউ মন খারাপ করলে গল্প করেন, আবার নিজের হাতে রান্না করে খাবারও পরিবেশন করেন।
রাজেকা বলেন, ‘আপনজনেরা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু এই মানুষগুলো কখনো আমাকে ছেড়ে যাবে না। এদের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক।’
মিঠাপুকুর উপজেলার সংগ্রামপুর গ্রামে রাজেকার জন্ম ১৯৮৩ সালে। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা রফিকুল ইসলাম স্থানীয় একটি মক্তবে শিক্ষকতা করতেন। মাসে মাত্র দুই হাজার টাকার আয়। অনেক দিন না খেয়েই স্কুলে যেতে হতো ভাইবোনদের। অভাবের মধ্যেও অন্যের কষ্ট দেখে স্থির থাকতে পারতেন না তিনি। নিজের খাবারও অনাহারী মানুষের হাতে তুলে দিতেন। বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম ছোটবেলায় তাঁকে শোনাতেন দেবী চৌধুরানীর সংগ্রাম ও মানবসেবার গল্প। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী সেই নারীর জীবনই ধীরে ধীরে রাজেকার মনে বুনে দেয় মানবসেবার স্বপ্ন।
২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজেকার বিয়ে হয় পীরগাছার রামচন্দ্রপাড়া চৌধুরানী গ্রামে। বিয়ের পরও দারিদ্র্য পিছু ছাড়েনি। অনেক দিন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটাতে হয়েছে। চাকরি না পেয়ে ২০০৫ সালে চৌধুরানী বাজারে একটি বিউটি পারলার চালু করেন তিনি। পাশাপাশি একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। তিন বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে ২০০৮ সালে স্বামীকে ব্যবসার জন্য মূলধন দেন। ব্যবসা সফল হয়। সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তখনই আবার জেগে ওঠে তাঁর পুরোনো স্বপ্ন, মানুষের জন্য কিছু করার। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র।
পুনর্বাসনকেন্দ্রটি চালাতে গিয়ে সামনে আসে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে গলার সোনার চেইন, কানের দুল ও হাতের চুড়ি বিক্রি করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। সেই টাকা দিয়ে ২০ শতক জমি কিনে পুনর্বাসনকেন্দ্রের নামে লিখে দেন। এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি পরিবার। স্বামী তালাক দেন। মা–বাবা, ভাইবোনও দূরে সরে যান। সমাজের নানা কটূক্তিও শুনতে হয়েছে তাঁকে।
রাজেকা বলেন, ‘সব হারিয়েছি। কিন্তু অসহায় মানুষদের ছাড়িনি। আজ মনে হয়, সেই সিদ্ধান্তই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
২০১৮ সালের ২৫ আগস্ট ‘অসহায়ের সহায় রাজেকা’ শিরোনামে মানবসেবার গল্প প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হওয়ার পর সাড়া পড়ে যায় দেশজুড়ে। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কেউ নগদ অর্থ পাঠান, কেউ টিন, কেউ ইট। পরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পুনর্বাসনকেন্দ্রটি নিবন্ধন পায়।
বর্তমানে এখানে ২৩ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বসবাস করছেন। গত ৯ বছরে ২০১ জন তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন। ১৯ জন শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই আশ্রয়েই।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মানুষের সহায়তায় চার কক্ষবিশিষ্ট নতুন একটি পাকা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এই প্রতিবেদককে দেখে বয়স্ক কেন্দ্রের ঘর থেকে রাজেকা বেরিয়ে এলেন। প্রথম আলোর পাঠকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘প্রতি মাসে কেন্দ্র চালাতে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগে। দেশের মানুষের সহযোগিতাতেই সব চলছে। একজন ১০ হাজার ইট দিয়েছেন। সেই ইট দিয়েই নতুন ভবনের কাজ শুরু করেছি।’
একগাল হেঁসে রাজেকা বলেন, ‘যত দিন বেঁচে থাকব, এই মানুষগুলোর সেবা করেই বাঁচতে চাই।’
রাজেকার ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে মানুষের বিপদ-আপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াত রাজেকা। ২০ শতক জমিও পুনর্বাসনকেন্দ্রের নামে লিখে দিয়েছেন। এতে আমার বাবা-মা, অন্য ভাই-বোনেরা তাঁকে অপদস্থ করেছে। এখন তারা বুঝতে পেরেছে, রাজেকাকে অপদস্থ করে ঠিক করেননি।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘রাজেকা রহমান অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাঁর কাজ আমরা কাছ থেকে দেখেছি। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’