উম্মতের প্রতি নবীজির ৭ হক
· Prothom Alo

নবীজির প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু দায়িত্ব ও অধিকার। একজন মানুষের ওপর যেমন তার পরিবারের অধিকার থাকে, তেমনি বিশ্বনবীরও তাঁর উম্মতের ওপর সুনির্দিষ্ট কিছু হক বা অধিকার রয়েছে।
Visit fish-roadgame.com for more information.
সেই অধিকারগুলো সাতটি প্রধান ভাগে বুঝে নেওয়া যায়।
১. তাঁর বাণীতে পূর্ণ আস্থা রাখা
উম্মতের ওপর নবীজির প্রথম ও প্রধান হক হলো, তিনি যে আল্লাহর প্রেরিত সত্য রাসুল—তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা নিঃশর্তভাবে সত্য বলে মেনে নেওয়া।
আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, “অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং আমি যে নুর অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি ইমান আনো; আর তোমরা যা করো আল্লাহ সে বিষয়ে পূর্ণ অবগত।” (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ৮)
নবীজি বলেছেন, “আমি মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ পেয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমার প্রতি ও আমি যা নিয়ে এসেছি তার প্রতি ইমান আনে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১)
অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকারোক্তি ও কাজের সমন্বয় ছাড়া এই হক আদায় হয় না।
২. দ্বিধাহীন আনুগত্য করা
বিশ্বাস যখন অন্তরে জায়গা করে নেয়, তখন তার প্রকাশ ঘটে আনুগত্যে। আল্লাহর আদেশ মানা যেমন ফরজ, তেমনি রাসুলের নির্দেশ মেনে চলাও সমানভাবে বাধ্যতামূলক। কারণ নবীজির কথা মূলত আল্লাহরই ইচ্ছার প্রকাশ।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো; আর তোমরা শোনার পরও তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।” (সুরা আনফাল, আয়াত: ২০)
জীবনের প্রতিটি ধাপে কোন পথ বেছে নিতে হবে, তা স্পষ্ট করে আল্লাহ বলেন, “রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)
রাসুল (সা.) আনুগত্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, “যে আমার আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল; আর যে আমার অবাধ্য হলো, সে মূলত আল্লাহরই অবাধ্য হলো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৫৭)
তিনি আরও বলেছেন, “আমার উম্মতের প্রত্যেকেই বেহেশতে যাবে, শুধু সে ছাড়া যে অস্বীকার করল।” সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কে অস্বীকার করল? তিনি বললেন, “যে আমার আনুগত্য করল সে বেহেশতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হলো সে-ই মূলত অস্বীকার করল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮০)
নবীজির নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, “অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা যেন সতর্ক হয় যে কোনো বিপর্যয় তাদের গ্রাস করবে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদের ওপর নেমে আসবে।” (সুরা নুর, আয়াত: ৬৩)।
চালচলন, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক আচরণ থেকে শুরু করে ব্যবসা ও সামাজিক লেনদেন—সবকিছুতেই নবীজির সুন্নতের অনুসরণই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার একমাত্র পথ।‘তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে’
৩. সুন্নত অনুযায়ী জীবন সাজানো
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকে একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা তাঁর অন্যতম বড় হক। চালচলন, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক আচরণ থেকে শুরু করে ব্যবসা ও সামাজিক লেনদেন—সবকিছুতেই নবীজির সুন্নতের অনুসরণই আল্লাহর প্রিয় হওয়ার একমাত্র পথ।
পবিত্র কোরআনে এসেছে, “বলো, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তবে আমার অনুসরণ করো; তবেই আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
সুন্নতকে পাশ কাটিয়ে নিজের খেয়ালখুশিমতো চলাকে সতর্ক করে নবীজি বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)
৪. নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসা
উম্মতের ওপর নবীজির আরেকটি অপরিহার্য হক হলো, হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে তাঁকে ভালোবাসা। এই ভালোবাসা হতে হবে বাবা-মা, সন্তানসন্ততি, ধনসম্পদ এবং নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি।
কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে যে পার্থিব কোনো সম্পদ বা সম্পর্ক যেন কখনোই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসার ওপরে স্থান না পায়। (সুরা তাওবাহ, আয়াত: ২৪)
হাদিসে বলা হয়েছে, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান এবং গোটা মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫)
একদিন সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এসে নবীজিকে বললেন, ‘আমার নিজের প্রাণ ছাড়া আপনি আমার কাছে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে প্রিয়।’ রাসুল (সা.) তখন বললেন, “না ওমর, যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার শপথ, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় হব, ততক্ষণ তোমার ইমান পূর্ণ হবে না।”
ওমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সংশোধন করে বললেন, ‘এখন আল্লাহর শপথ, আপনি আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও প্রিয়।’ তখন নবীজি বললেন, “এখন হে ওমর, এখন তোমার ইমান পূর্ণ হলো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৩২)
এই নিখাদ ভালোবাসার ফলও অপরিসীম। এক সাহাবি নিজের অল্প আমল নিয়ে শঙ্কিত হয়ে নবীজিকে ভালোবাসার কথা জানালে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “তুমি পরকালে তার সঙ্গেই থাকবে, যাকে তুমি ভালোবাসো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৬৮)
৫. যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন
নবীজিকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা উম্মতের নৈতিক দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেছেন, “যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনো এবং রাসুলকে সর্বাত্মক সাহায্য করো ও তাঁকে গভীর সম্মান প্রদর্শন করো।” (সুরা ফাতহ, আয়াত: ৯)
নবীজির সামনে সাহাবিরা যেমন শ্রদ্ধায় অবনত থাকতেন, তাঁর তিরোধানের পরও এই শ্রদ্ধাবোধ অটুট রাখা জরুরি। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে শ্রদ্ধার সঙ্গে দরুদ পড়া, তাঁর কোনো হাদিস বা সুন্নাতকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের হাত থেকে রক্ষা করা এবং সমাজে তাঁর সত্যবাণীকে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট থাকা এই হকের অন্তর্ভুক্ত।
মুসলমানের ছয়টি হক ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)আজানের পর, মসজিদে প্রবেশকালে, জুমার দিনে কিংবা যেকোনো বিপদের সময়ে দরুদ পাঠ মনকে শান্ত করে এবং বান্দার মর্যাদা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।রাসুল (সা.) বলেছেন, “ধর্ম হলো শুভাকাঙ্ক্ষা ও কল্যাণকামিতা।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য? তিনি বললেন, “আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য এবং মুসলিমদের নেতা ও সাধারণ মানুষের জন্য।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৫)
রাসুলের প্রতি কল্যাণকামিতার অর্থই হলো তাঁর রিসালাতকে সত্য জানা, তাঁর সুন্নতকে রক্ষা করা এবং সমাজে তাঁর চরিত্র ও শিষ্টাচার ছড়িয়ে দেওয়া।
৬. নিয়মিত দরুদ ও সালাম পেশ করা
নবীজির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হলো তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠানো। এটি এমন এক মহিমান্বিত আমল, যা আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা সার্বক্ষণিক করে থাকেন।
কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন; হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পড়ো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।” (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৬)
নবীজির ওপর একবার দরুদ পাঠের বিনিময়ে আল্লাহ বান্দার ওপর দশটি রহমত বর্ষণ করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৮৪)
আর যার সামনে নবীজির পবিত্র নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও সে অলসতা করে দরুদ পড়ে না, তাকে নবীজি চরম কৃপণ আখ্যা দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪৬)
ইমাম ইবনুল কাইয়িম তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে আজানের পর, মসজিদে প্রবেশকালে, জুমার দিনে কিংবা যেকোনো বিপদের সময়ে দরুদ পাঠ মনকে শান্ত করে এবং বান্দার মর্যাদা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ, জালাউল আফহাম ফি ফাদলিস সালাতি ওয়াস সালাম আলা খায়রিল আনাম, পৃষ্ঠা: ৩২৫, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ১৯৮৭)
একটিমাত্র দরুদে দশটি রহমত ছাড়াও দশটি পাপমোচন ও দশটি মর্যাদার স্তর বৃদ্ধি পাওয়ার ঘোষণা রয়েছে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১২৯৭)
৭. জীবনের শেষ ফয়সালাকারী মানা
যেকোনো বিরোধ, সংশয় কিংবা মতপার্থক্য দেখা দিলে নবীজির শিক্ষাকে চূড়ান্ত মীমাংসা হিসেবে মেনে নেওয়া আবশ্যক।
আল্লাহ শপথ করে বলেন, “অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ, তারা কখনোই বিশ্বাসী হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিবাদে আপনাকে বিচারক মেনে নেয়; অতঃপর আপনার দেওয়া ফয়সালার ব্যাপারে মনে কোনো দ্বিধা না রাখে এবং তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেয়।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৬৫)
এর পাশাপাশি নবীজির হক হলো—তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদায় রাখা; বাড়াবাড়িও না করা, আবার অবহেলাও না করা। তিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও নেতা; কিন্তু তিনি উপাস্য নন, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
কোরআনে বলা হয়েছে, “বলো, আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডার রয়েছে, আর না আমি অদৃশ্য জানি; আমি এ কথাও বলি না যে আমি কোনো ফেরেশতা; আমি তো শুধু সেই ওহির অনুসরণ করি যা আমার কাছে পাঠানো হয়।” (সুরা আনআম, আয়াত: ৫০)
তিনি মানুষ ছিলেন এবং নশ্বর পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী তিনি দেহত্যাগ করেছেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষা কেয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর। (সুরা জুমার, আয়াত: ৩০)
মুখে শুধু ভালোবাসার দাবি না তুলে যদি আমরা আমাদের কথাবার্তা, পরিবারের সঙ্গে আচরণ, কাজের সততা এবং অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মাঝে নবীজির আদর্শ ধরে রাখতে পারি—তবেই উম্মত হিসেবে তাঁর হক কিছুটা হলেও আদায় করা সম্ভব হবে।
আল্লাহর হক, বান্দার হক