২০৩৪ সালে আমরা কেমন অর্থনীতি চাই

· Prothom Alo

শুধু বড় অর্থনীতি নয়, আমাদের এমন এক বাংলাদেশ প্রয়োজন, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনে, জনসেবায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে। লিখেছেন গোলাম রসুল।

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে চায় সরকার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি ছিল প্রায় ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে এক ট্রিলিয়নে পৌঁছাতে ডলারের হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বাড়তে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের হার বর্তমানের প্রায় ২৭ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি নিতে হবে। লক্ষ্যটি কঠিন। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোই আসল পরীক্ষা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন অর্থনীতি গড়ে সেই এক ট্রিলিয়নে পৌঁছাব: সেই অর্থনীতি কার জন্য, কিসের ওপর দাঁড়িয়ে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছে?

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

জিডিপি মানে একটি দেশে উৎপাদিত ও কেনাবেচা হওয়া পণ্য ও সেবার আর্থিক মূল্য। কিন্তু সেই উৎপাদন ও কেনাবেচা মানুষের জীবন কতটা ভালো করল, জিডিপি তা বলে না। তাই শুধু প্রবৃদ্ধি কত হলো, সেটি দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, প্রতিটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যয় উৎপাদনক্ষমতা, ভালো কর্মসংস্থান ও মানুষের কল্যাণ বাড়াচ্ছে, নাকি দুর্বল ব্যবস্থার ক্ষতি সামলাতেই তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে? প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বড় অর্থনীতি মানে বেশি কাজ, বেশি আয়, বেশি রাজস্ব এবং দারিদ্র্য কমানোর বেশি সুযোগ। তবে যেটা লক্ষণীয় তা হলো, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ভিন্ন ভিন্ন পথে গড়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রের ব্যর্থতার খরচও জিডিপিতে যোগ হয়

অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু জিডিপির সীমাবদ্ধতা বোঝাতে একটি সহজ উদাহরণ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হলে একটু সচ্ছল পরিবার নিরাপত্তারক্ষী রাখে। তাঁর বেতন জিডিপিতে যোগ হয়। অথচ রাস্তাঘাট নিরাপদ থাকলে এই খরচ করতে হতো না। এর মানে হলো, জিডিপি বাড়ল, কিন্তু মানুষের জীবনমান সেই হারে বাড়ল না।

এই সীমাবদ্ধতার কারণেই জাতিসংঘের ‘যা গুরুত্বপূর্ণ, তারই হিসাব’ (কাউন্টিং হোয়াট কাউন্টস) শীর্ষক প্রতিবেদনে জিডিপির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ, ন্যায্যতা ও পরিবেশের স্থায়িত্ব মাপতে কয়েকটি মূল সূচকের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বা ‘ড্যাশবোর্ড’ প্রস্তাব করা হয়েছে। উদ্দেশ্য জিডিপি বাদ দেওয়া নয়; দেশের অগ্রগতির ছবিটি পূর্ণ করা। বাংলাদেশে বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক। কারণ, এখানে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই সরকারি সেবার ঘাটতি নিজের পকেট থেকে পূরণ করতে হয়।

ইলন মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ কেন ক্ষতিকর

মৌলিক সেবার জন্য নাগরিকের ‘দ্বৈত ব্যয়’

বাংলাদেশের বহু পরিবার কর দেওয়ার পরও মৌলিক সেবার জন্য আবার ব্যক্তিগত ব্যয় করতে বাধ্য হয়। এই ব্যয়ের বড় অংশ জিডিপিতে যোগ হয়, কিন্তু তা সব সময় মানুষের কল্যাণ বাড়ায় না। ঢাকার আবাসিক ভবনে নিরাপত্তারক্ষী, লোডশেডিংয়ের জন্য আইপিএস বা জেনারেটর, নিরাপদ পানির জন্য ফিল্টার বা জারের পানি—সবই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু এর একটি অংশ নতুন কোনো কল্যাণ তৈরি করে না; শুধু দুর্বল ব্যবস্থার ফাঁক ভরাট করে। গ্রামেও একই চিত্র। বিদ্যুৎ অনির্ভরযোগ্য হলে বা সংযোগ না থাকলে অনেক কৃষক ডিজেলচালিত পাম্পে সেচ দেন। জ্বালানির এই বাড়তি খরচ তাঁর উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়।

এমন ব্যয়কে বলা যায় ‘আত্মরক্ষামূলক ব্যয়’; অর্থাৎ কার্যকর জনসেবা থাকলে যার বড় অংশ এড়ানো যেত। এর বোঝা সবার ওপর সমান নয়। ধনী পরিবারের বাজেটে যা সামান্য, দরিদ্র পরিবারের বাজেটে তা অনেক ভারী। পানির ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির (জেএমপি) হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো পানির উৎসের নাগাল পায়। কিন্তু নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানি পায় মাত্র ৫৯ শতাংশের মতো। উৎস থাকা আর নিরাপদ পানি পাওয়া এক কথা নয়। তাই অনেকে পানি ফুটিয়ে, ফিল্টার করে বা বোতল-জারের পানি কিনে খান। এই খরচও জিডিপিতে যোগ হয়। কিন্তু এর কতটা পছন্দের ব্যয়, আর কতটা অনিরাপদ পানির ঝুঁকি সামলানোর খরচ, জিডিপি তা বলে না।

বায়ুদূষণের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি খাটে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়; অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান। দূষণে অসুস্থ হয়ে মানুষ ওষুধ, চিকিৎসা ও হাসপাতালে যে অর্থ খরচ করে, তা–ও জিডিপিতে যোগ হয়; অর্থাৎ দূষণ ক্ষতি করছে আর সেই ক্ষতি সামলানোর খরচও প্রবৃদ্ধির হিসাবে উঠছে।

স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা আরও সরাসরি। জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৪–৭০ শতাংশ) পরিবারকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়; সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের কম। এই ব্যয় জিডিপি বাড়ায়। কিন্তু চিকিৎসার খরচ মেটাতে যদি সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ঋণ করতে হয় বা সম্পদ বেচতে হয়, তাহলে শুধু ব্যয়ের অঙ্ক দেখে পরিবারের কল্যাণ বোঝা যায় না।

শিক্ষায়ও একই প্রশ্ন। সরকারি শিক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। ফলে অনেক পরিবার কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভর করে। প্রাইভেট টিউশন শেখার মান বাড়াতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিদ্যালয়ে যে শিক্ষা পাওয়ার কথা, তার জন্য যদি আলাদা করে টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে সেই ব্যয়ের একটি অংশ আসলে ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণের খরচ।

একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার। নিরাপত্তারক্ষী, চিকিৎসক, শিক্ষক বা গৃহশিক্ষকের কাজ মূল্যহীন নয়। তাঁদের সেবা বাস্তব এবং মূল্যবান। প্রশ্ন হলো, এই ব্যয়ের কতটা মানুষের পছন্দের বাড়তি সেবা, আর কতটা এমন ঘাটতি পূরণ, যা কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে করতে হতো না। জিডিপি এই পার্থক্য দেখায় না।

জিডিপির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, প্রকৃতি–পরিবেশ–প্রতিবেশকে বুঝতে না পারা। ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ বা শিল্পে ব্যবহার করলে উৎপাদন বাড়ে, জিডিপিও বাড়ে। কিন্তু ঢাকায় বা বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর যখন নেমে যায়, তখন যে সম্পদ ক্ষয় হচ্ছে, তার কোনো হিসাব কোথাও থাকে না। উর্বর মাটি, নদী ও জলাভূমির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। জিডিপি আয় গোনে, কিন্তু আয় করতে গিয়ে যে প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ হলো, তা বাদ দেয় না। ফলে আজকের প্রবৃদ্ধি অনেক সময় আগামী প্রজন্মের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে অর্জিত হয়।

ব্যবসার বাড়তি বোঝা

কারখানার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। বিদ্যুৎ অনির্ভরযোগ্য হলে উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটর, আইপিএস বা ব্যাকআপ ব্যাটারি কিনতে হয়। এই বিনিয়োগ জিডিপিতে গণনা হয়। কিন্তু এর একটি অংশ নতুন উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করে না; শুধু বিদ্যমান উৎপাদন সচল রাখে। আর জেনারেটর চালানোর জ্বালানি জিডিপি বাড়ায় না, উল্টো উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মুনাফা কমায়।

যানজট, বন্দরের ধীরগতি, পণ্য পরিবহনে দেরি বা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতায়ও একই ঘটনা ঘটে। বাড়তি সময়, বাড়তি মজুত ও বাড়তি খরচ ব্যবসার ঘাড়ে চাপে। রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এর অর্থ প্রতিযোগিতাসক্ষমতা কমে যাওয়া। অন্য দেশের কারখানা যে খরচ করে না, আমাদের কারখানাকে তা করতে হয়। এখানেই জিডিপির সীমাবদ্ধতা। জিডিপি ভুল হিসাব করছে না; সেটা শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্য গুনছে। কিন্তু সেই কর্মকাণ্ডের কতটা নতুন সক্ষমতা তৈরি করছে, আর কতটা পুরোনো ঘাটতির খরচ মেটাচ্ছে, তা আলাদা করে দেখা যায় না।

যে ক্ষয়ের হিসাব জিডিপি রাখে না

জিডিপির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, প্রকৃতি–পরিবেশ–প্রতিবেশকে বুঝতে না পারা। ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ বা শিল্পে ব্যবহার করলে উৎপাদন বাড়ে, জিডিপিও বাড়ে। কিন্তু ঢাকায় বা বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর যখন নেমে যায়, তখন যে সম্পদ ক্ষয় হচ্ছে, তার কোনো হিসাব কোথাও থাকে না। উর্বর মাটি, নদী ও জলাভূমির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। জিডিপি আয় গোনে, কিন্তু আয় করতে গিয়ে যে প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ হলো, তা বাদ দেয় না। ফলে আজকের প্রবৃদ্ধি অনেক সময় আগামী প্রজন্মের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে অর্জিত হয়।

বেশি বিনিয়োগ, নাকি ভালো বিনিয়োগ?

এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে শুধু বেশি বিনিয়োগ করলেই হবে না; দেখতে হবে বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল হচ্ছে। প্রচলিত হিসাবে, বাংলাদেশে মূলধন–উৎপাদন অনুপাত (আইসিওআর) প্রায় ৪ দশমিক ৫; অর্থাৎ বাড়তি এক টাকার উৎপাদনের জন্য সাড়ে চার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়।

যে তিন ‘আর’ দিয়ে রণকৌশল সাজালে বিনিয়োগ বাড়বে

মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিয়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ধরে রাখতে চাইলে বিনিয়োগের হার ৩৮–৪০ শতাংশে নিতে হতে পারে। এটি কোনো যান্ত্রিক সূত্র নয়। প্রকল্প শেষ হতে দেরি, ব্যয় বৃদ্ধি, অব্যবহৃত সক্ষমতা ও অনির্ভরযোগ্য অবকাঠামো একই বিনিয়োগ থেকে পাওয়া ফল কমিয়ে দেয়। তাই প্রশ্ন শুধু কত টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে তা নয়; প্রতিটি টাকা কতটা নতুন উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করছে।

মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও একই কথা। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত তরুণ যদি দীর্ঘদিন বেকার থাকেন বা শিক্ষার সঙ্গে মেলে না, এমন কাজে যুক্ত হন, তাহলে ক্ষতি শুধু ওই তরুণের নয়; দেশের একটি মূল্যবান সম্পদও পূর্ণ সম্ভাবনায় কাজে লাগছে না। বড় অর্থনীতির পাশাপাশি দরকার দক্ষতা ও শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান।

আরেকটি কথা। লক্ষ্যটি যেহেতু ডলারে মাপা, তাই বিনিময় হারের প্রভাবও দেখা জরুরি। দেশে দাম বাড়লে এবং টাকার বিনিময় হার স্থির থাকলে ডলারের হিসাবে জিডিপি বড় দেখাতে পারে, অথচ তাতে নতুন কারখানা, ভালো কাজ বা ভালো জনসেবা তৈরি হয় না। উল্টোটাও সত্য। টাকার মান কমলে প্রকৃত উৎপাদন বাড়লেও ডলারের হিসাবে লক্ষ্য দূরে সরে যায়। মানুষের জীবনমান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সেবার বাস্তব উন্নতির ওপর।

জিডিপির পাশে একটি ছোট ড্যাশবোর্ড

জিডিপি বাদ দেওয়ার দরকার নেই, তাকে অন্য কোনো একক সূচক দিয়ে প্রতিস্থাপনেরও দরকার নেই; বরং জিডিপির পাশে তিনটি প্রশ্নের ওপর দাঁড়ানো একটি সংক্ষিপ্ত জাতীয় ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যায়, যা নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষ দুজনেই সহজে পড়তে পারবেন।

প্রথম প্রশ্ন, মৌলিক জনসেবা কি কার্যকর হচ্ছে? পরিবারগুলো নিরাপত্তা, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ, পানি পরিশোধন, কোচিং ও নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয়ে কত খরচ করছে, তা আলাদা করে দেখানো যায়। সঙ্গে থাকতে পারে বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা, বায়ুর মান ও শিক্ষার ফল। দ্বিতীয় প্রশ্ন, শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কি বাড়ছে? এ জন্য খাতভিত্তিক শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে মেলে এমন কর্মসংস্থান মাপা যায়। তৃতীয় প্রশ্ন, বিনিয়োগ কি কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে এবং প্রবৃদ্ধি কি টেকসই? প্রকল্প শেষ করতে কত সময় লাগছে, ব্যয় কত বাড়ছে, সক্ষমতার কতটা ব্যবহার হচ্ছে, আর এক টাকা বাড়তি উৎপাদনে কত বিনিয়োগ লাগছে, তা দেখা যায়। সঙ্গে থাকবে ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি ও জলাভূমির অবস্থা।

কোনটি আত্মরক্ষামূলক ব্যয়, তা প্রতিটি টাকা ধরে আলাদা করার দরকার নেই। এসব খাতে পরিবারের ব্যয় বাজেটের কত অংশ, সময়ের সঙ্গে তা বাড়ছে না কমছে, সেটুকু দেখলেই যথেষ্ট। এ কাজ শুরু করা যায় পরিবারের আয়-ব্যয় জরিপের মতো বিদ্যমান জরিপ কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূচকগুলো সংকলন করতে পারে, পরিকল্পনা কমিশন ২০৩৪ সালের জন্য এসব সূচকের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে পারে, আর জাতীয় বাজেটের সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি এসব সূচকের অগ্রগতিও প্রকাশ করা যায়।

প্রতীকী ছবি

‘আগে প্রবৃদ্ধি, পরে সেবা?’

কেউ বলতে পারেন, আগে প্রবৃদ্ধি হোক, জনসেবা পরে ঠিক হবে। প্রবৃদ্ধি ছাড়া সেবার অর্থ জোগাড় হবে না, এ কথা সত্য। কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, নির্মল বায়ু, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা ও ভালো বিদ্যালয় প্রবৃদ্ধির পরের বিষয় নয়, প্রবৃদ্ধির ভিত্তি। এসব ভালো হলে পরিবার ও ব্যবসাকে ঘাটতি পূরণে কম খরচ করতে হবে। সেই অর্থ তারা খাদ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও সঞ্চয়ে লাগাতে পারবে। এতে উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। বিদ্যুৎ–সংকটে কারখানা বন্ধ থাকা, দূষণে শ্রমিক অসুস্থ হওয়া কিংবা অদক্ষ বন্দরে রপ্তানি আটকে যাওয়া তো প্রবৃদ্ধিকেই ধীর করে; অর্থাৎ সেবার উন্নতি প্রবৃদ্ধির বিকল্প নয়, তার শর্ত।

২০৩৪ সালের দুই বাংলাদেশ

ধরা যাক, ২০৩৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু সেই অর্থনীতি দুই রকম হতে পারে: এক. বাংলাদেশে বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্য, কলের পানি নিরাপদ, বায়ু তুলনামূলক নির্মল, স্বাস্থ্যসেবা সাশ্রয়ী এবং শিশুরা বিদ্যালয়েই মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। দুই. অন্য বাংলাদেশেও জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু পরিবারগুলোকে বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি মেটাতে নিজের পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হচ্ছে। নিরাপদ পানি ও ভালো চিকিৎসা ধনী পরিবার কিনে নিতে পারে, দরিদ্র পরিবারের সে সামর্থ্য নেই। আর ভূগর্ভের পানি আরও নিচে নেমেছে।

জিডিপির হিসাবে দুই বাংলাদেশ একই। মানুষের জীবনের হিসাবে তারা এক নয়। তাই প্রবৃদ্ধি কত হলো, এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রশ্ন করতে হবে। উৎপাদনশীলতা কি বাড়ল? ভালো কর্মসংস্থান কি তৈরি হলো? জনসেবা কি উন্নত হলো? পরিবার ও ব্যবসার আত্মরক্ষামূলক ব্যয় কি কমল? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ কি সুরক্ষিত থাকল? এক ট্রিলিয়ন ডলার বড় মাইলফলক হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা সেখানে কী নিয়ে পৌঁছাব। শুধু বড় অর্থনীতি নয়, আমাদের এমন এক বাংলাদেশ প্রয়োজন, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনে, জনসেবায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে।

  • গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source